দুই দশক পর ইরাক ছাড়ল মার্কিন বাহিনী

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৩ অপরাহ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৩ অপরাহ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসানকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরতে ইরাকে চার দিন ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরাকে থাকা কয়েকশ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব সেনা ২০১৫ সালে শুরু হওয়া ইসলামিক স্টেট (আইএস/আইএসআইএল)বিরোধী জোটের অভিযানে মূলত পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

আরও পড়ুন: স্ত্রীর মৃত্যুর পর হাসপাতালে মাহাথির মোহাম্মদ

প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে এই প্রত্যাহার ইরাকের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার তার বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে দেশটির সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে ইরানপন্থি বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সংগঠনও রয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আল-জায়েদি বলেন, শান্তি ও যুদ্ধের বিষয়ে রাষ্ট্রই যেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং অস্ত্র ও ক্ষমতার উপকরণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকে—এ লক্ষ্যেই তার সরকার কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জোটের মিশন শেষ হওয়ার পর সামরিক সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতার দিকে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন: রাশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বোমারু বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৬

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস সিলিম্যানের মতে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মিলিশিয়াগুলোকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কৌশলের অংশ হতে পারে। এসব গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অস্ত্র ও পৃথক কমান্ড কাঠামো বজায় রাখার যুক্তি হিসেবে ইরাকের মাটিতে মার্কিন ও অন্যান্য বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতির কথা বলে এসেছে।

তবে এই পরিস্থিতিতে ইরাকে ইরানের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকভিত্তিক কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যদি মার্কিন স্বার্থে হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে ওয়াশিংটনের চাপ বাড়তে পারে।

নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতায় ইরাক

২০১৭ সালে আইএসের দখল করা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। তবে দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর পরও এই স্থিতিশীলতা মোটামুটি বজায় ছিল।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি মিলিশিয়াদের নিরস্ত্র ও সরকারি বাহিনীতে একীভূত করার পরিকল্পনাও এগিয়ে নিচ্ছে ইরাক। তবে সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার আগের ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

আল-জায়েদি জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ৯০ দিন কোনো হামলা না চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানপন্থি মিলিশিয়াগুলো আশ্বাস দিয়েছে। তবে চ্যাথাম হাউসের ইরাক ইনিশিয়েটিভের পরিচালক রেনাদ মানসুরের মতে, ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো আঞ্চলিকভাবে এখনো সক্রিয় এবং তারা মার্কিন স্বার্থে হামলা চালিয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাকের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে দেশটিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে নিষেধাজ্ঞা বা ইরাকের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বাড়তে পারে।

সামরিক সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার দুই দেশের সম্পর্ককে সামরিক সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বের দিকে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার একটি ধাপ। ২০০৩ সালের মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর ইরাকে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। ২০১১ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর আইএসের উত্থানের সময় আবারও মার্কিন বাহিনী ইরাকে ফিরে আসে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আল-জায়েদি ইরাকে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ এবং হরমুজ প্রণালির বাইরে নতুন জ্বালানি সরবরাহপথ তৈরির উদ্যোগের কথা বলেন।

তবে আঞ্চলিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। একই সঙ্গে সংঘাত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় থাকার সুযোগ তৈরি করে বলেও মত দিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, ইরাকের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ দেওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। একই সঙ্গে ইরাককে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে নিজস্ব ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

 সূত্র: আল-জাজিরা