ইরান ঘিরে আরও ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০২ পূর্বাহ্ন, ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:০২ পূর্বাহ্ন, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসেবে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ওই অঞ্চলের দিকে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে আরও ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও নৌসদস্য মোতায়েন করা হতে পারে। 

আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়েছে। এর একদিন পর মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করে। এই ইউনিটে দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নৌ ও সামরিক মোতায়েনের মাধ্যমে মোট ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা, নাবিক ও মেরিন সদস্য যুক্ত হতে পারেন। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশের অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর হামলা বাহিনী অবস্থান নিতে পারে। 

নতুন মোতায়েনের মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অতিরিক্ত বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে যুক্ত হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই এগোক না কেন, সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখাই এই মোতায়েনের অন্যতম উদ্দেশ্য। 

আরও পড়ুন: মক্কার পর এবার মদিনার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা হুথিদের

মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই রয়েছে হাজারো মার্কিন সেনা

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কয়েক দশক ধরে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন রয়েছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল। চলতি বছর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পর অঞ্চলটিতে আরও যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।

যুদ্ধের আগে কী কী সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছিল

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক বিমান চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি মার্কিন সামরিক বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ই-৩ সেন্ট্রি, এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে।

এ ছাড়া যুদ্ধের সময় অতিরিক্ত মেরিন ও সেনাসদস্যও পাঠানো হয়েছে। ট্রিপোলি অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নৌসদস্য অঞ্চলে যুক্ত হন। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার সেনাকেও পাঠানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাত হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন মোতায়েন কি যুদ্ধ আরও বাড়ার ইঙ্গিত

নতুন করে বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অর্থ যুদ্ধ আরও বাড়বে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ানোর কৌশলও হতে পারে।

ইরান এর আগে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা চেয়েছিল তেহরান। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হোক। ফলে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কূটনৈতিক আলোচনা চলছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনাতেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পথ খোঁজার কথাও জানিয়েছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সংঘাত খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় না এলে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

এর ফলে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনাও চলছে। নতুন করে মোতায়েন করা বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ব্যবহার করবে, সেটিই এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতিপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


সূত্র: আল-জাজিরা