৮০০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ২০ লাখ মেরিনারদের পারফর্ম্যান্সের ওপর : নৌপরিবহন মন্ত্রী
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ৮০০ কোটি মানুষের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পণ্য এবং ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ১৮ থেকে ২০ লাখ মেরিনারদের পারফর্ম্যান্সের ওপর। নিশ্চয়ই তাদের যোগ্যতা, সাহস, বিশেষ জ্ঞান আছে বলেই আলাদাভাবে আমি তাদের সম্পদ মনে করি। যথেষ্ট সম্ভাবনা আমাদের ছিল, আমরা সেটাকে কাজে লাগাতে পারিনি। পারিনি বিধায় পারব না সেটা তো নয়। কিন্তু মেরিটাইম সেক্টরের সম্ভাবনাকে অযত্নে, অবহেলায়, বিনা পদক্ষেপে ব্যর্থ হতে দিতে চান না নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এই সেক্টর দেশের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি বুঝেছি। প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেগুলো সমাধানে বিশেষ পদক্ষেপের অঙ্গীকার করছি।
চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ‘বিশ্ব মেরিটাইম দিবস’ এবং ‘মেরিন একাডেমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই অঙ্গীকারের কথা জানালেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় একাডেমি ক্যাম্পাসে ছিল এ অনুষ্ঠান। এর আগে অনুষ্ঠানে নৌমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিবের সামনে মেরিন একাডেমি অ্যালামনাই, মেরিন পেশাজীবী, মেরিটাইম সেক্টরের কর্মরত প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ সেক্টরের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রবন্ধ উত্থাপন করেন। এরপর বক্তব্যে সমস্যা, চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। পরে উত্তরণের উপায় জানান মন্ত্রী।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বললেন, ক্যাডেটদের ১ বছর জাহাজে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে জটিলতা দূর করা, ভিসা জটিলতা নিরসনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। এ সেক্টরে মনোযোগ বাড়িয়েছি। সরকার অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে, প্রচুর বাজেট দিচ্ছে। অর্থনীতি পাল্টে দেওয়ার সক্ষমতা রাখা এ সেক্টরে কীভাবে দেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায় সেটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা দিচ্ছি।
একাডেমির ক্যাডেটদের দারুণ প্রশংসা করে মন্ত্রী জানালেন, ক্যাডেটরা সাহসী ও পরিশ্রমী। তাদেরকে আমি সম্পদ মনে করি। আপনারা ভালো সবকিছু করতে পারেন। আমরা এ ফোর্সটাকে আলাদা গুরুত্ব, আলাদা মর্যাদা দিতে চাই। তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলেই আজকের অনুষ্ঠান সফল।
আরও পড়ুন: মধ্যরাতে বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান
নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া বললেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। জনশক্তি রপ্তানিতে প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশ। আর সিফেয়ারার বা মেরিনারস সরবরাহকারী দেশ হিসেবে যখন দেখি, তখন অবস্থান ৫০ দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। কই আট, কই পাঁচ, আর সিফেয়ারারের ক্ষেত্রে আমরা ৫০ নম্বর!সেই অবস্থা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা দরকার। আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জগুলো আমরা মোকাবিলা করে মেরিনারস সরবরাহকারী হিসেবে আমরা প্রথম ১০ নম্বরে যেতে চাই।স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিকে এগিয়ে নিতে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মূল প্রবন্ধে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর শফিউল বারি ২৯টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন, পুরনো রেগুলেশন সংশোধন এবং ‘গ্রিন ভয়েজ ২০৫০’-এর অংশ হিসেবে জীবাশ্মজ্বালানি থেকে বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মহাসাগরকে শুধু সম্পদের উৎস নয়, বরং দায়িত্ব¡ ও যৌথ নেতৃত্বের সুযোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানালেন, যে খাতে হাজার হাজার মার্চেন্ট মেরিন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন, সেই খাতের নীতিনির্ধারণী ও অ্যাকাডেমিক নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বেশ সীমিত। আমাদের প্রশাসনে বিশেষায়িত মেরিন ক্যাডারের ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিপিং প্রশাসনে মেরিন ক্যাডার ও দক্ষ মেরিটাইম পেশাজীবী অর্ন্তভূক্তি জরুরি।
বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু সমুদ্রগামী নাবিক তৈরিই যথেষ্ট নয়; শিপ ম্যানেজমেন্ট, পোর্ট অপারেশন, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, শিপ রিসাইক্লিং, মেরিন ইনস্যুরেন্স এবং অন্যান্য শোর-বেজড মেরিটাইম সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমন্বিত সামুদ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম।
দিবসটি উপলক্ষে ক্যাডেট কর্তৃক প্রধান অতিথিকে গার্ড অব অনার, প্যারেড পরিদর্শন, র্যালি, বেলুন উড্ডয়ন, বৃক্ষরোপণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা, মেরিটাইম খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সরকারি কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্যাডেট ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘ ৬৪ বছরের পথচলায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দেশের মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের ব্লু ইকোনমি, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একাডেমি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।একাডেমির প্রশিক্ষিত ৫ হাজারের বেশি মেরিনার বর্তমানে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিশ্বের বিভিন্ন মেরিটাইম প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ও ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক আয় ও রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে নারী ক্যাডেটদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় ১২৫ জনেরও বেশি নারী মেরিনার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি গত ৬৪ বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেরিটাইম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে আসছে। কর্ণফুলীর মোহনায় জুলদিয়ায় অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠান ওগঙ ঝঞঈড মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।





