আমানত বাড়লেও গতি নেই বেসরকারি ঋণে

Sanchoy Biswas
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

- আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ, ঋণে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ

- খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা

আরও পড়ুন: রাষ্ট্র মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকা: অর্থমন্ত্রী

- ঋণঝুঁকি ও বিনিয়োগের ধীরগতিতে চাপে ব্যাংক খাত

- সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

আরও পড়ুন: রূপালী ব্যাংক পিএলসিতে ব্যাবের আংশিক কমিটি গঠন

দেশের ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে প্রত্যাশিত গতি নেই। একদিকে ব্যাংকে আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি রয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংগৃহীত অর্থের কার্যকর ব্যবহার, বেসরকারি বিনিয়োগের গতি এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল খেলাপি ঋণের চাপ, ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিনিয়োগে ধীরগতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট- আগস্ট ২০২৬ অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৩৩ হাজার ১০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৩০ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এ খাতে বার্ষিক ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের গতি আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেই সেই অর্থের পুরোটাই নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব হয় না। আমানতের বিপরীতে নির্ধারিত তারল্য সংরক্ষণ, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের যোগ্যতা এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হয়। পাশাপাশি ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ ঋণব্যয়, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও ঋণপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আমানতের প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধির ব্যবধান শুধু ব্যাংকের হাতে অর্থ থাকার বিষয় নয়; সেই অর্থ বিনিয়োগে ব্যবহারের উপযুক্ত পরিবেশ ও ঋণগ্রহীতার চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের আয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখতে হয়, যা নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃত ও সক্ষম উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্কভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়। তবে খেলাপি ঋণের দায় সাধারণ ঋণগ্রহীতা বা আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, ঋণের অর্থের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, অনিয়মের জবাবদিহি এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর যথাযথ তদারকি ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা জরুরি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এ বিষয়ে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

বিপুল অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী থাকলে ব্যাংকের আয়, মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখতে হওয়ায় নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো ঋণ অনুমোদনে সতর্ক হলে প্রকৃত ও সক্ষম উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন পেতেও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমার পেছনে শুধু খেলাপি ঋণকে দায়ী করা যায় না; বিনিয়োগের চাহিদা, ঋণের ব্যয়, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম থাকলে শিল্পের উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো ঋণ আদায় নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় নতুন ঋণ বিতরণ বাড়লেও ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা, অনিয়মের জবাবদিহি এবং ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতের উপযুক্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং ঋণের ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নীতিগত সুদহার পরিবর্তন করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; ঋণপ্রবাহ বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ- একদিকে খেলাপি ঋণের চাপ কমিয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, অন্যদিকে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো। আমানত সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সেই অর্থ কার্যকর বিনিয়োগে রূপান্তরিত না হলে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন। তাই ঋণ বিতরণে সুশাসন, জবাবদিহি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোই ব্যাংক খাতে আস্থা ও গতিশীলতা ফেরানোর অন্যতম শর্ত।