ছুটিতে প্রশান্তির খোঁজে বিনোদন কেন্দ্র পার্কে নগরবাসী

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৪:০৮ অপরাহ্ন, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৩:১৮ পূর্বাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

#  নগরবাসীর স্বস্তির এক টুকরো ঠিকানা ‘রমনা পার্ক’ অন্যতম আকর্ষণ সবুজ পরিবেশ

# পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব দর্শনার্থীদের

আরও পড়ুন: টঙ্গীতে গ্যাস বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৩ জন দগ্ধ

প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রশান্তি খুঁজছেন কেউ, কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে, আবার কারও কাছে প্রিয়জনদের সঙ্গে আড্ডার জায়গা। ইট-পাথরের ব্যস্ত রাজধানীতে ছুটির দিনে রমনা পার্ক হয়ে উঠেছে নগরবাসীর স্বস্তির এক টুকরো ঠিকানা। তবে রমনা পার্কের অন্যতম আকর্ষণ এর সবুজ পরিবেশ উপভোগ করতেই বেশির ভাগ মানুষ ছুটে যায় বলে জানা গেছে।

বুধবার সকাল গড়াতেই রমনা পার্কে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ হাঁটছেন, কেউ শরীরচর্চায় ব্যস্ত, আবার কেউ গাছের ছায়ায় বসে উপভোগ করছেন সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশ। সপ্তাহজুড়ে যানজট, কর্মব্যস্ততা আর নাগরিক কোলাহলে ক্লান্ত মানুষের কাছে দুর্গাপূজার লম্বা ছুটিতে এই সবুজ প্রাঙ্গণ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ার জায়গা হয়ে উঠেছে। পার্কের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি গাছ, সবুজ ঘাসে ঢাকা খোলা জায়গা আর আঁকাবাঁকা হাঁটার পথ। কোথাও কয়েকজন বন্ধু গল্পে মেতে উঠেছেন, কোথাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলছে খুনসুটি। কেউ মুঠোফোনে ধরে রাখছেন প্রিয় মুহূর্তের ছবি, কেউবা নিরিবিলি বসে কাটাচ্ছেন নিজের মতো কিছুটা সময়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে খোলা জায়গা ও সবুজের গুরুত্ব অনেক।

আরও পড়ুন: অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মদ পার্টিতে আটক ৮৫ যুবক-যুবতীকে কারাদণ্ড

প্রতিদিনের কাজের চাপ, যানবাহনের শব্দ, ধুলাবালি আর কংক্রিটের দেয়ালে ঘেরা জীবনের বাইরে একটু প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ খোঁজেন নগরবাসী। রমনা পার্ক সেই সুযোগ করে দেয়। ছুটির দিনে অনেকেই ভোরে ঘুম থেকে উঠে চলে আসেন রমনা পার্কে। কেউ হাঁটেন, কেউ হালকা ব্যায়াম করেন, আবার কেউ পরিচিতজনদের সঙ্গে গল্প করতে করতে সময় কাটান। বয়সের ভিন্নতা থাকলেও সবার মধ্যে রয়েছে একটি মিল প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা। পার্কে আসা একজন চাকরিজীবীর কাছে ছুটির দিনের সকাল মানেই নিজের জন্য কিছুটা সময়। সারা সপ্তাহ অফিসের কাজ, যানজট আর নানা দায়িত্বের মধ্যে কাটে তার দিন। এমন একজন শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, সারা সপ্তাহ কাজের চাপে নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন। ছুটির দিনে এখানে এলে খোলা পরিবেশে হাঁটতে পারি। গাছপালা আর নির্মল বাতাসের মধ্যে কিছুক্ষণ থাকলে মনটা অনেক হালকা লাগে। প্রবীণ দর্শনার্থীদের অনেকের কাছেই রমনা পার্ক নিয়মিত শরীরচর্চার জায়গা।

অন্যদিকে তরুণদের কাছে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, ছবি তোলা কিংবা খোলামেলা পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। শিশুদের কাছে সবুজ মাঠ ও খোলামেলা পরিবেশ এনে দেয় আনন্দের ভিন্ন মাত্রা। ছুটির দিন মানেই অনেক পরিবারের কাছে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। কর্মজীবী মা-বাবা সারা সপ্তাহ ব্যস্ত থাকায় সন্তানদের নিয়ে ঘোরাঘুরির সময় পান না। তাই ছুটির দিনে অনেকেই সন্তানদের হাত ধরে চলে আসেন রমনা পার্কে।

শিশুরা সবুজের মধ্যে ছোটাছুটি করে, গাছপালা দেখে আনন্দ পায়। মা-বাবারাও কাজের ব্যস্ততা থেকে দূরে এসে সন্তানদের সঙ্গে গল্প করেন, ছবি তোলেন কিংবা পাশাপাশি বসে সময় কাটান। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতেও এমন সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আমেনা আক্তার বলেন, আমরা সন্তানদের শুধু ঘরের মধ্যে রেখে বড় করলে হবে না। তাদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিতে হবে। এখানে এসে ওরা খোলামেলা পরিবেশে খেলতে পারে, গাছপালা দেখতে পারে। আমরাও পরিবারের সবাই মিলে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পাই। কোনো কোনো পরিবার পার্কের নিরিবিলি জায়গায় বসে হালকা খাবার খায়। আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়। ব্যয়বহুল বিনোদনের বাইরে অল্প খরচে কিংবা বিনা খরচে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগই রমনা পার্ককে অনেকের কাছে বিশেষ করে তুলেছে। রমনা পার্কের অন্যতম আকর্ষণ এর সবুজ পরিবেশ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো, বাতাসে পাতার মৃদু দোল আর পাখির ডাক শহরের ব্যস্ততার মধ্যে অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করে। হাঁটার পথ ধরে এগোতে এগোতে অনেকেই কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যান বাইরের ব্যস্ত শহরকে।

মন ভালো রাখতে এবং দৈনন্দিন চাপ সামলাতে অবসর সময়ের গুরুত্ব রয়েছে। খোলা পরিবেশে হাঁটা,গাছপালার সান্নিধ্যে থাকা কিংবা পরিচিত মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি পেতে সহায়ক হতে পারে। এ কারণে শুধু বিনোদন নয়, নগরবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও পার্কটির গুরুত্ব রয়েছে। পার্কে আসা কলেজ শিক্ষার্থী সম্পা খাতুন বলেন, ঢাকায় এমন খোলা ও সবুজ জায়গা খুব প্রয়োজন।

দিনের বেশির ভাগ সময় পড়াশোনা, কাজ কিংবা মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এখানে এলে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা যায়, ছবি তোলা যায়, আবার নিজের মতো করেও সময় কাটানো যায়। ছুটির দিনে এমন পরিবেশ সত্যিই ভালো লাগে। বিশেষ করে যারা দিনের বেশির ভাগ সময় অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ঘরের মধ্যে কাটান, তাদের জন্য পার্কে কিছুটা সময় কাটানো হতে পারে স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতা। ছুটির দিনের সকালে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার এই সুযোগ অনেকের পরবর্তী কর্মদিবসের প্রস্তুতিকেও আনন্দময় করে তোলে। রমনা পার্ক শুধু অবসর কাটানোর জায়গা নয়, রাজধানীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকার নগরজীবনের বিকাশের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুরোনো গাছ, বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গণ এবং পরিচিত পরিবেশ পার্কটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। আধুনিক নগরায়ণের চাপে ঢাকার অনেক খোলা জায়গা সংকুচিত হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় রমনা পার্কের মতো সবুজ এলাকা নগরবাসীর জন্য বিশেষ সম্পদ। এটি একদিকে যেমন প্রকৃতির সান্নিধ্য দেয়, অন্যদিকে শহরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের একই জায়গায় মিলিত হওয়া পার্কটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য। এখানে কেউ শরীরচর্চা করেন, কেউ পরিবার নিয়ে আসেন, আবার কেউ নিভৃতে বসে সময় কাটান। মানুষের এই বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি পার্কটিকে শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, নগরজীবনের একটি প্রাণবন্ত অংশে পরিণত করেছে। পার্কের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি এর পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করাও দর্শনার্থীদের দায়িত্ব। যেখানে-সেখানে খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল কিংবা অন্যান্য বর্জ্য ফেলে রাখলে নষ্ট হয় পরিবেশের সৌন্দর্য। একই সঙ্গে গাছপালা ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পার্কে ঘুরতে আসা জুয়েল রানা বলেন, আমরা সবাই চাই পার্কটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন থাকুক। কিন্তু শুধু কর্তৃপক্ষের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। নিজেদের ব্যবহৃত ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে, গাছপালার ক্ষতি করা যাবে না। একটু সচেতন হলেই পার্কের পরিবেশ আরও সুন্দর রাখা সম্ভব।

তিনি বলেন, পার্কে নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, গাছের ক্ষতি না করা,উচ্চশব্দে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না করা এবং অন্য দর্শনার্থীদের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। পার্কের অবকাঠামো ও সবুজ পরিবেশ সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরে রমনা পার্কের গুরুত্ব আরও বাড়াতে নিয়মিত পরিচর্যা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং সবুজের পরিমাণ ধরে রাখার উদ্যোগ জরুরি। কারণ, এই পার্কের সৌন্দর্য শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আর এক দর্শনার্থী রাইয়ান বলেন, ছুটি শেষে আবারও ফিরতে হবে ব্যস্ত কর্মজীবনে। শুরু হবে যানজট, কাজের চাপ, সময়ের হিসাব আর নানা দায়িত্বের চেনা ছক। তার আগে পরিবার নিয়ে ঘুরে যাচ্ছি। রমনা পার্কের সবুজ পরিবেশে কাটানো কয়েকটি মুহূর্ত মনের মধ্যে কিছুটা প্রশান্তি নিয়ে এসেছে।