নতুন রাজনৈতিক দল, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি: এম. এ. মতিন
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—নতুন রাজনৈতিক দল, প্ল্যাটফর্ম, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক পরিচয়ের আবির্ভাব। নীতিগতভাবে এটি উদ্বেগের কারণ নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়া, বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি উপস্থাপন করা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্নটি শুধু কতগুলো নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি হচ্ছে—তা নয়।
আরও পড়ুন: তেলের দাম বাড়ায় কিলোমিটার প্রতি ২০ পয়সা বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব
প্রকৃত প্রশ্ন হলো: কেন এত নতুন দল তৈরি হচ্ছে, তারা কী প্রতিনিধিত্ব করছে এবং জাতীয় রাজনীতিতে তারা কোন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আসছে?
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা নতুন রাজনৈতিক শক্তি, তরুণ নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। নতুন দলের আবির্ভাব তাই গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের স্বাভাবিক প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। একটি দেশে বহু রাজনৈতিক দল থাকতে পারে, অথচ দুর্নীতি, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন অব্যাহত থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—বাংলাদেশ হয়তো নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করবে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবে না।
আরও পড়ুন: মরিয়মকাণ্ডে জমায়াত এমপি গাজী নজরুল ৪দিনের ১ম স্ত্রী একদিনের রিমান্ডে
নতুন দল, পুরোনো রাজনীতি
একটি দলের নাম, পতাকা, প্রতীক, স্লোগান বা নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই রাজনৈতিক সংস্কার হয় না। সত্যিকারের নতুন রাজনৈতিক দলকে সত্যিকার অর্থেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।
যদি কোনো নতুন দল প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর পুরোনো ও ক্ষতিকর চর্চা—ব্যক্তিপূজা, পৃষ্ঠপোষকতা, পেশিশক্তি, অর্থের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি, অসহিষ্ণুতা, ভূমি দখল এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যবহার—অনুসরণ করে, তাহলে অর্থবহ অর্থে সেটিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি বলা কঠিন।
এটি তখন শুধু নতুন পোশাকে পুরোনো রাজনীতি
বাংলাদেশে অতীতে বহু রাজনৈতিক আন্দোলন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সংস্কার ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যখন ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের সম্পদে প্রবেশাধিকার অর্জন করেছে, তখন তাদের কিছু নেতা ও কর্মী ধীরে ধীরে সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে উঠেছেন, যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারা একসময় কথা বলেছিলেন। এই চক্রই ভাঙতে হবে।
কেন নতুন দল?
বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন তরুণ কর্মী ও নতুন নেতৃত্বের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অসন্তোষ বিকল্প শক্তির জন্য রাজনৈতিক স্থান তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠিত দলগুলো যখন বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সমাধান কিংবা কার্যকর জবাবদিহিতা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিকল্প খোঁজেন।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রক্ষমতা এখনো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকে নীতিনির্ধারণ, সরকারি সম্পদ, ঠিকাদারি, নিয়োগ, প্রশাসনিক প্রভাব এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগের প্রবেশাধিকার।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো কি আদর্শ ও জনসেবার ভিত্তিতে গড়ে উঠছে, নাকি নতুন প্রভাববলয় ও অর্থনৈতিক সুবিধার নেটওয়ার্ক তৈরির আকাঙ্ক্ষাও এর পেছনে কাজ করছে? এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিনিয়োগ ছাড়াই রাজনীতি যখন ব্যবসা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ক্ষতিকর দিক হলো—রাজনীতি কখনো কখনো প্রচলিত বিনিয়োগ ছাড়াই জীবিকা বা অর্থনৈতিক সুযোগের বিকল্প পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
একটি বৈধ ব্যবসায় মূলধন, জ্ঞান, দক্ষতা, পরিকল্পনা, ঝুঁকি ও কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্যোক্তাবাদ যেন একটি ভিন্ন মডেল তৈরি করতে পারে: সময়, আনুগত্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সমর্থন বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক সুযোগের প্রবেশাধিকার অর্জন।
এটি কখনোই স্বল্পআয়ের বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের রাজনীতিতে প্রবেশের বিরুদ্ধে যুক্তি নয়। গণতন্ত্র সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন রাজনৈতিক আনুগত্য দক্ষতার বিকল্প এবং রাজনৈতিক প্রভাব উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
তখন রাজনৈতিক বাজারে মূলধন বা পেশাগত দক্ষতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষমতার কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা, আনুগত্য, প্রভাব, সংগঠিত করার সামর্থ্য এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। বাংলাদেশকে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
রাজনৈতিক সান্নিধ্য যখন অর্থনৈতিক সম্পদ
রাজনৈতিক নেতাদের ছবি, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন ক্ষমতাবান নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ছবি সর্বত্র প্রদর্শিত হয়, তখন সেটি কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের প্রদর্শনেও পরিণত হতে পারে।
অন্তর্নিহিত বার্তাটি হতে পারে:
“ক্ষমতার কেন্দ্রে আমার প্রবেশাধিকার আছে।” তখন একটি ছবি রাজনৈতিক পরিচয়পত্রের মতো কাজ করতে পারে—প্রভাব প্রতিষ্ঠা, বিশেষ সুবিধা পাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভয় দেখানো অথবা ক্ষমতাবান নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে। তাই প্রশ্ন শুধু কেন রাজনৈতিক কর্মীরা নেতাদের ছবি ব্যবহার করেন—তা নয়।
প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সান্নিধ্য কী ধরনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার সৃষ্টি করে?
যদি রাজনৈতিক পরিচয় সরকারি চুক্তি, ব্যবসায়িক সুযোগ, জমি, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষার পথ হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনীতি আর শুধু জনসেবার মাধ্যম থাকে না; তা অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
চাঁদাবাজি: জনগণের ওপর অদৃশ্য কর
এই রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রকাশগুলোর একটি হলো চাঁদাবাজি। দোকানদার, ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, ঠিকাদার, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ডেভেলপার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করার অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপরও স্থানান্তরিত হতে পারে।
একজন বিক্রেতা চাঁদার অর্থ দীর্ঘদিন নিজের লাভ থেকে বহন করতে পারবেন না; তা পণ্যের মূল্যে যুক্ত হতে পারে। কোনো ঠিকাদার অবৈধ অতিরিক্ত ব্যয় প্রকল্পের দামে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। একটি ব্যবসা রাজনৈতিক চাপের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হলে সেই বোঝা ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। এইভাবে চাঁদাবাজি সাধারণ মানুষের ওপর একটি অদৃশ্য কর হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে বৈধ করের অর্থ রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনসেবায় ব্যয় হয়। চাঁদাবাজির অর্থ উৎপাদনশীল নাগরিকদের কাছ থেকে সম্পদ সরিয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি, ব্যবসার পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—সবই।
চাঁদাবাজি থেকে সম্পত্তি দখল
অর্থ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের নেটওয়ার্ক জমি, বাড়ি, দোকান, ভবন বা কারখানা দখলের অভিযোগের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। সম্পত্তির অধিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। রাজনৈতিক প্রভাব বা পেশিশক্তির মাধ্যমে বৈধ মালিকানা অগ্রাহ্য করা গেলে বিনিয়োগের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, নাগরিকরা যদি মনে করেন যে অবৈধ দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তারা হুমকি, ভাঙচুর, জোরপূর্বক দখল, শারীরিক হামলা বা উচ্ছেদের শিকার হতে পারেন, তাহলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
অপহরণ, হত্যা বা যৌন সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে সেগুলো কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এগুলো ফৌজদারি অপরাধ এবং স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার কারণ হতে পারে না।
চাঁদা আদায়কারীদের রক্ষা করে কে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও চাঁদাবাজি বা অন্যান্য অনিয়মে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পর্ক কী?
এমন অভিযোগ রয়েছে যে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীরব থাকেন। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, রাজনৈতিক কর্মীদের সংগৃহীত অবৈধ অর্থের একটি অংশ ওপরের দিকে প্রবাহিত হয়ে রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সুবিধা দিতে পারে।
এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে পুনরাবৃত্তি না করে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
তবে প্রশ্নগুলো থেকেই যায়:
চাঁদা আদায়কারীদের রক্ষা করে কে?
এই অর্থের সুবিধা পায় কে?
রাজনৈতিক সুরক্ষা দেয় কে?
যদি কোনো নেতা জানেন যে তার নাম ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে এবং তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি কোনো নেতা বা মধ্যস্থতাকারী অবৈধভাবে সংগৃহীত অর্থ গ্রহণ করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাজনীতি ও আইন প্রয়োগ যখন জড়িয়ে যায়
কোনো চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন কার্যকর থাকতে হলে কোনো না কোনো ধরনের সুরক্ষা প্রয়োজন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের ধারণা অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে না, তখন রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে যায়। একজন দোকানদার জানেন কে টাকা দাবি করছে, কিন্তু অভিযোগ করতে ভয় পান। একজন জমির মালিকের কাছে বৈধ কাগজপত্র আছে, কিন্তু নিজের সম্পত্তি রক্ষায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। একজন ব্যবসায়ী জানেন কে তার কাজে বাধা দিচ্ছে, কিন্তু অভিযোগ করলে আরও বড় বিপদের আশঙ্কায় নীরব থাকেন। যখন নাগরিকের কাছে নীরবতাই নিরাপদ মনে হয়, তখন আইনের শাসন কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন দল যেন পুরোনো নেটওয়ার্কে পরিণত না হয় এখানেই নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত পরীক্ষা।
প্রতিটি নতুন দলের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত:
তারা কি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ দাবি করা কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে?
ভূমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত সদস্যদের কি দলীয় পরিচয় দিয়ে রক্ষা করবে?
তাদের কর্মীরা নাগরিকদের ভয় দেখালে দলীয় নেতৃত্ব কি হস্তক্ষেপ করবে?
সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত সদস্যদের কি দলীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে?
দলের অর্থের হিসাব কি স্বচ্ছ থাকবে?
নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধেও কি স্বাধীন তদন্তের সুযোগ থাকবে?
অবৈধ রাজনৈতিক দাবিতে রাজি না হওয়া নাগরিকদের কি দল সুরক্ষা দেবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে শুধু দলের নাম পরিবর্তন করে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ তখন নতুন রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের আড়ালে পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের পুনরাবৃত্তি দেখতে পারে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক মাফিয়ার প্রয়োজন নেই বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনসেবামুখী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
নেতাদের বুঝতে হবে—রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাজনৈতিক কর্মীরা রাজস্ব আদায়কারী নন; সরকারি চুক্তি রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো দলের ব্যক্তিগত কার্যালয় নয়; আর নাগরিকরা রাজনৈতিক আয়ের উৎস নন।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নীতি, আদর্শ, কর্মসূচি ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে—পেশিশক্তি, ভয়ভীতি, পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে নয়।
তরুণ নেতৃত্বের উত্থান একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু তরুণ হওয়াই সংস্কারের নিশ্চয়তা নয়। একজন তরুণ রাজনীতিবিদও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসরণ করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক নৈতিকতা।
ক্ষমতার আগে নয়, ক্ষমতার পরেই প্রকৃত পরীক্ষা
নতুন রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সংস্কার, জবাবদিহিতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় যখন তারা ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জন করে।
তখন কি তারা তাদের নেতার সমালোচনা করা নাগরিককে রক্ষা করবে?
দলীয় কর্মীর অবৈধ দাবিতে রাজি না হওয়া ব্যবসায়ীকে কি তারা সুরক্ষা দেবে?
কোনো দলীয় সদস্য জমি দখল করলে কি তাকে শাস্তি দেবে?
তাদেরই কোনো মন্ত্রী দুর্নীতিতে জড়িত হলে কি তারা তদন্তের সুযোগ দেবে?
তাদের নেতাদের বিরুদ্ধেও কি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তদন্ত করতে পারবে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তারা কি নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে নতুন দলগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেবে।
রাজনৈতিক পুনর্গঠন, শুধু পুনঃব্র্যান্ডিং নয়
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি সুযোগ রয়েছে—পুরোনো রাজনৈতিক চক্র ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ।
কিন্তু পুরোনো দলের পরিবর্তে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতা।
সরকারি পদকে ব্যক্তিগত ব্যবসার সুযোগ নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। রাজনীতির মাধ্যমে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, সুযোগের নামে অর্থ আদায় নয়। রাজনৈতিক কর্মীদের নাগরিকদের সেবা করতে হবে, তাদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ানো নয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগকে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। জমি ও সম্পত্তির অধিকার আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশের শুধু বেশি রাজনৈতিক দল দরকার নেই।
প্রয়োজন ভালো রাজনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথ নয়; বরং জনগণের অর্পিত দায়িত্ব। নতুন রাজনৈতিক দলের বর্তমান বিস্তার বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগের সাফল্য নির্ভর করবে দলগুলোর নাম, প্রতীক বা নেতার ওপর নয়—তাদের রাজনৈতিক আচরণ ও নৈতিকতার ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই:
এই নতুন দলগুলো কি শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করতে চায়, নাকি তারা সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিই পরিবর্তন করতে চায়, যে সংস্কৃতি ক্ষমতাকে এত লাভজনক করে তুলেছে? বাংলাদেশের এমন নতুন মুখের প্রয়োজন নেই, যারা পুরোনো যন্ত্রই পরিচালনা করবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি—যা পুরোনো রাজনৈতিক যন্ত্রকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে।





