সরকারের চাপ নয়, বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পেছাচ্ছে: ইসি আনোয়ারুল ইসলাম
- নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোটের সুযোগ দেখছে না ইসি : জানুয়ারিতে শুরুর আশা
- তফসিল ভোটের ৪০-৪৫ দিন আগে
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক-দুই মাসে
সরকারের চাপ নয়, সংবিধান, আইন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় পুনর্বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নভেম্বর-ডিসেম্বরে বার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা থাকায় ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের কোনো সুযোগ দেখছে না কমিশন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আগামী জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু করার আশা করছে তারা। তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখের ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা করছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের কোনো চাপ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মোটেই না।’ তার বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন বাস্তববিবর্জিত কোনো কাজ করে না এবং সংবিধান ও আইনের বাইরে যায় না।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আমরা সংবিধান, তারপরে আইন এবং বাস্তবতা বিবেচনা করে কাজ করি।’
আরও পড়ুন: মধ্যরাতে বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আগে যে সময়গুলোকে সম্ভাব্য হিসেবে বিবেচনা করেছিল, সেগুলো কোনো চূড়ান্ত তারিখ ছিল না। এখন বাস্তব পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সময় কিছুটা সামনে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় যাতে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের কারণে বিঘ্ন না ঘটে, সেটিই কমিশনের অন্যতম বিবেচনা।
নভেম্বর-ডিসেম্বরে সুযোগ দেখছে না ইসি
নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন শুরু হবে কি না—এ প্রশ্নে কমিশনার বলেন, বার্ষিক পরীক্ষা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় এ পর্যায়ে ওই সময়ে নির্বাচন করার কোনো সুযোগ তারা দেখছেন না।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সম্ভাব্যভাবে ১২ নভেম্বর থেকে নির্বাচন শুরু করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও দেখা গেছে, এর পরপরই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। এর সঙ্গে বন্যার কারণে কোনো কোনো এলাকায় স্থগিত হওয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সমন্বয়, পরীক্ষার পর পাঠ্যসূচি শেষ করার চাপ এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাটের বিষয়ও সামনে এসেছে।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে শুরু হলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অংশ নেবেন এবং তাদের সন্তানদেরও অনেকে পরীক্ষার্থী। ফলে বিষয়টি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়, লাখ লাখ পরিবারকেও প্রভাবিত করবে।
এ ছাড়া পাবলিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একই সময়ে নির্বাচন ও বড় পরিসরের পরীক্ষা আয়োজন বাস্তবিকভাবেও কঠিন বলে মনে করছে কমিশন।
জানুয়ারিতে নির্বাচন, তবে এখনো চূড়ান্ত নয়
আগামী জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার আশা প্রকাশ করেছেন আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তবে তিনি একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন, এটি এখনো সম্ভাব্য সময়; নির্দিষ্ট নির্বাচনী তারিখ নয়।
তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হলে বা জানুয়ারির দিকে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে কমিশন আশা করছে।
তফসিলের সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনের তারিখ থেকে ‘মোর অর লেস’ ৪০-৪৫ দিনের ব্যবধান রেখে তফসিল ঘোষণার চিন্তা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ভোট হলে তার প্রায় ৪০-৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। ৫ বা ২০ জানুয়ারি ভোট হলে সেই অনুযায়ী তফসিলের সময়ও পরিবর্তিত হবে। এর মাধ্যমে পরীক্ষার সময় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রভাব এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে জানুয়ারির সম্ভাব্য সময়ও চূড়ান্ত নয়। কমিশন পুরো বিষয়টি ‘হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচে’ বিবেচনা করছে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে হতে পারে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সম্ভাব্যভাবে এক-দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে।
‘নির্বাচন কমিশন কারও চাপে কাজ করছে?’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন পেছানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারি চাপের আলোচনা রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার পাল্টা প্রশ্ন করেন, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কারও চাপে কোনো কাজ করেছে বলে সাংবাদিকদের মনে হয়েছে কি না।
এরপর তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বাস্তববিবর্জিত কোনো কাজ করে না। আইনের বাইরে যায় না, সংবিধানের বাইরে যায় না।’
সরকারের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে যোগাযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, যোগাযোগ বিভিন্নভাবে হতে পারে—চিঠি, ফোন কিংবা সরাসরি সাক্ষাৎ। তবে নির্বাচন কোন তারিখে করতে হবে বা নির্দিষ্ট কোনো তারিখে নির্বাচন করলে সুবিধা হবে—এমন নির্দেশনা দিয়ে সরকারি কোনো চিঠি চালাচালির নজির তিনি কমিশনের নথিপত্রে পাননি।
তার ভাষায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান আর নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে নির্দেশনা—দুটি বিষয় এক নয়।
তথ্য দেবে মন্ত্রণালয়, সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার জানান, ইউনিয়ন পরিষদগুলো নির্বাচন উপযোগী কি না, মামলা-মোকদ্দমা, সীমানা নির্ধারণ, মেয়াদ পূর্তি, নতুন ইউনিয়ন সৃজনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তথ্য চায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই তথ্য সরবরাহ করে। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই কমিশন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে।
গত ৯ জুলাই কমিশনের চাওয়া তথ্যের জবাব পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। তবে কতগুলো ইউনিয়ন বর্তমানে নির্বাচনযোগ্য—তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারেননি।
৬ জুনের মধ্যে সব ভোট?
আগামী জানুয়ারিতে নির্বাচন শুরু হলে ৬ জুনের মধ্যে সব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করা সম্ভব হবে কি না—এ প্রশ্নেও নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেননি কমিশনার।
তিনি জানান, ৬ জুন একটি সম্ভাব্য টাইমলাইন হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু মামলা-মোকদ্দমা, সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধ ও নতুন ইউনিয়ন সৃজনের মতো বিষয় নিষ্পত্তি হলে নির্বাচনযোগ্য ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়তে পারে।
তার হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে প্রায় ৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ধাপে ধাপে এত বিপুলসংখ্যক ইউনিয়নের নির্বাচন সম্পন্ন করতে সময়ের হিসাবও পরিবর্তিত হতে পারে।
আইন সংশোধন না হলেও বিদ্যমান আইনেই ভোট
স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন সংশোধনের জন্য কমিশন সরকারের কাছে কিছু পর্যবেক্ষণ পাঠিয়েছে বলেও জানান আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে কমিশন কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। বিষয়টির প্রধান অংশীজন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সরকার ও সংসদ। তারা বিষয়টি বিবেচনা ও আলোচনা করবে।
তফসিল ঘোষণার আগে আইন সংশোধন না হলে কী হবে—এ প্রশ্নে তার সরাসরি বক্তব্য, ‘বিদ্যমান আইনে হবে।’
অর্থাৎ আইন সংশোধনের সিদ্ধান্তের ওপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনকে অনিশ্চিত করে রাখার কোনো অবস্থান কমিশনের নেই।
একাধিক সাংবিধানিক ও বাস্তব সংকট
আগামী বছরের নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষা নয়, রমজান, ঈদ, পূজা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাসহ একাধিক জাতীয় ও সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে বলে জানান কমিশনার।
তিনি বলেন, সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময়ের ‘স্লট’ বের করার চেষ্টা করছে কমিশন।
এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—একদিকে সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্বের মধ্যে থেকে নির্বাচন আয়োজন, অন্যদিকে পরীক্ষা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির সঙ্গে সময়ের সমন্বয়।
হলফনামা নিয়ে অভিযোগ এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা
সংরক্ষিত আসনের এক সংসদ সদস্যের নির্বাচনী হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার প্রসঙ্গেও নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা।
তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের নজরে আসেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি সামনে এলে আইনগতভাবে যা করার, তা করা হবে।
অভিযোগের প্রয়োজন আছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি জানান, স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি এলে, কেউ তা পয়েন্ট আউট করলে কিংবা অভিযোগ করলে আইনগত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সেই পদ্ধতির মধ্যেই কমিশন ব্যবস্থা নেবে।
‘নির্বাচন তো হতেই হবে’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা না হওয়ায় নানা প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, সময় নির্ধারণের বিষয়টি এখনো সম্ভাব্য পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনটা তো হইতে হবে, নির্বাচনটা তো হবে ইনশাআল্লাহ।’
তবে তফসিল ঘোষণার আগে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা সমীচীন নয় বলে আবারও জানান তিনি। কমিশনের বর্তমান অবস্থান হলো—নভেম্বর-ডিসেম্বরের পরীক্ষা শেষ করে, অন্যান্য জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় রেখে, আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা।





