অলিখিত ফাইনাল আজ

এমবাপ্পের আগুনে ফ্রান্স, ইয়ামালের জাদুতে স্পেন—বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামী মহারণ

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৮:৩৫ অপরাহ্ন, ১৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৩ অপরাহ্ন, ১৩ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনা এখন চরমে। একদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার মিশনে ফ্রান্স, অন্যদিকে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ফেরার স্বপ্নে বিভোর স্পেন। আক্রমণ বনাম রক্ষণ, অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্য, এমবাপ্পে বনাম ইয়ামাল—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান ও বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই।

এমবাপ্পে-ইয়ামাল দ্বৈরথে বিশ্বজুড়ে চোখ:

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর হত্যার হুমকি পেলেন কলম্বিয়ার ফুটবলার

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু স্মরণীয় সেমিফাইনাল হয়েছে। তবে এবারের ফ্রান্স-স্পেন লড়াইকে ইতিমধ্যেই অনেকেই "অলিখিত ফাইনাল" বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই দলই মুখোমুখি হচ্ছে শিরোপার খুব কাছে এসে।

একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নের আত্মবিশ্বাস—দুইয়ের সংঘর্ষে রীতিমতো আগুন ঝরার অপেক্ষা।

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড গড়লেন লিওনেল মেসি

ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। পাঁচ ম্যাচে আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে তিনি। তাকে সহায়তা করছেন ওসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলার মতো গতিময় ফুটবলাররা।

অন্যদিকে স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা তাদের দলগত ফুটবল। মাঝমাঠে পেদ্রি, রদ্রি ও দানি ওলমোর নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে অসাধারণ শৃঙ্খলা এবং সামনে মিকেল ওইয়ারসাবালের গোল করার ক্ষমতা স্পেনকে করে তুলেছে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। যদিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল।

আক্রমণে ফ্রান্স, রক্ষণে স্পেন:

চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটি ফ্রান্সের। ছয় ম্যাচে ১৬ গোল করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।

স্পেনও আক্রমণে পিছিয়ে নেই। তারা ছয় ম্যাচে করেছে ১১ গোল। তবে আসল পার্থক্য তৈরি হয়েছে রক্ষণে।

পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন এবং পাঁচটি ম্যাচে ক্লিনশিট রেখেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল কতটা সংগঠিত ফুটবল খেলছে।

অর্থাৎ ম্যাচটি দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ বনাম সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষণভাগের লড়াই হিসেবে।

সাম্প্রতিক ইতিহাস স্পেনের পক্ষে:

অতীতের পরিসংখ্যানও স্পেনকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।

২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল স্পেন। এরপর উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও স্প্যানিশদের কাছেই পরাজিত হয় দেশমের শিষ্যরা।

সেই দুই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার বড় সুযোগ পাচ্ছে এবার ফ্রান্স।

'ভয়' শব্দটি নেই ফরাসিদের অভিধানে:

ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠেই কথা বলেছেন ফ্রান্সের দুই ডিফেন্ডার।

সেন্টার-ব্যাক ইব্রাহিমা কোনাতে বলেন, "কাউকে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমরা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামব।"

তিনি আরও বলেন, "স্পেনের দলে অসাধারণ সব ফুটবলার রয়েছে। শুধু ইয়ামাল নয়, পুরো দলকেই থামাতে হবে।"

আরেক ডিফেন্ডার ম্যাক্সিম লাকোঁ বলেন, "ভয় নয়, আমরা তাদের সম্মান করি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য একটাই—জয়।"

ইয়ামালকে ঘিরেই বাড়তি সতর্কতা:

চলতি বিশ্বকাপে এখনও নিজের সর্বোচ্চ ছন্দে দেখা যায়নি লামিন ইয়ামালকে। এখন পর্যন্ত একটি গোল করেছেন তিনি। তবু তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভাবছে ফ্রান্স। কারণ, প্রতিভাবান এই উইঙ্গার যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

লাকোঁর ভাষায়, "তাকে থামাতে যা যা প্রয়োজন, আমরা সবই করার চেষ্টা করব।" 

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দামী সেমিফাইনাল:

শুধু ফুটবল নয়, অর্থনৈতিক মূল্যেও এই ম্যাচ গড়তে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস। দুই দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে— ফ্রান্সের স্কোয়াড মূল্য প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার স্পেনের স্কোয়াড মূল্য প্রায় ১.৪৩ বিলিয়ন ডলার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান পাঁচ ফুটবলারের মধ্যে চারজনই খেলবেন এই ম্যাচে। সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় স্পেনের লামিন ইয়ামাল। এরপরই রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এছাড়া পেদ্রি ও মাইকেল অলিসেও বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলারদের তালিকায় রয়েছেন। দুই দলে এমন অন্তত ২২ জন ফুটবলার রয়েছেন, যাদের বাজারমূল্য ৫৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

কোথায় কে এগিয়ে? বাজারমূল্যের বিচারে— গোলরক্ষক বিভাগে এগিয়ে স্পেন। রক্ষণভাগে পরিষ্কারভাবে এগিয়ে ফ্রান্স। মিডফিল্ডে এগিয়ে স্পেন। আক্রমণভাগে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ফ্রান্স। তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—বাজারমূল্য নয়, শেষ কথা বলে মাঠের পারফরম্যান্স।

অভিজ্ঞ রেফারির কাঁধে দায়িত্ব:

এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করবেন এল সালভাদরের অভিজ্ঞ রেফারি ইভান বার্টন। ৪৪ বছর বয়সী এই রেফারি চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।

গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে-তুরস্ক ম্যাচে মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষকে অপমানজনক কথা বলার ঘটনায় ভিএআর দেখে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। ফিফার নতুন নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।

ফাইনালের টিকিট কার?

একদিকে এমবাপ্পের গতির ঝড়, দেম্বেলের ড্রিবলিং আর অলিসের সৃজনশীলতা। অন্যদিকে পেদ্রির পাসিং, রদ্রির নিয়ন্ত্রণ, ইয়ামালের বিস্ময়কর প্রতিভা এবং স্পেনের অভেদ্য রক্ষণ। সব হিসাব-নিকাশ বলছে, এটি হতে যাচ্ছে পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উপভোগ্য ম্যাচগুলোর একটি। ফ্রান্স চাইছে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত করতে। স্পেন চাইছে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ফিরতে।

দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, তারকাদের উপস্থিতি, কৌশলগত লড়াই এবং রেকর্ড গড়া বাজারমূল্য—সব মিলিয়ে মঙ্গলবার রাতের এই সেমিফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ নয়, আধুনিক ফুটবলের দুই দর্শনের এক মহাসংঘর্ষ। যে দল এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তারা শুধু ফাইনালের টিকিটই পাবে না; বিশ্বকাপ শিরোপার দৌড়েও নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।