রাবিতে বেড়েছে সাপের উপদ্রব, চলতি বছরেই উদ্ধার ৮৫ সাপ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা থেকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ৮৫টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি বিষধর এবং বাকি প্রায় ৭০টি নির্বিষ সাপ। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে বনজঙ্গলবেষ্টিত এলাকা ডুবে যাওয়া এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় সাপের আনাগোনা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। সম্প্রতি আবাসিক হলে বিষধর সাপের কামড়ে এক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোয়ান (SWAN) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা থেকে এসব সাপ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া বিষধর সাপের মধ্যে রয়েছে ১২টি গোখরা, দুটি কালাচ ও একটি রাসেলস ভাইপার। এর মধ্যে দুটি কালাচই বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে রাসেলস ভাইপারটি ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে উদ্ধার করা হয়।
আরও পড়ুন: সোনাগাজীতে সোশ্যাল এইডের উদ্যোগে অভিবাসন সচেতনতা কর্মশালা
সংগঠনটির রেসকিউ টিমের সদস্য ফাহিম মুনতাসির রাফিন বলেন, “বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে বনজঙ্গলবেষ্টিত এলাকা ডুবে গেলে সাপ আবাসস্থল সংকটে পড়ে মানুষের সংস্পর্শে আসে। এ বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই প্রায় ২৪টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো ক্যাম্পাস ও আশপাশের মেস এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, সাপের খবর পেলে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবহিত করে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকেরা নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী সাপ উদ্ধার করেন। ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধার করা সাপ বন বিভাগের পরামর্শে জনবসতিহীন বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়। ক্যাম্পাসের বাইরের সাপগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন: সংসদে ডা. বাচ্চুর উত্থাপিত ভূমি জটিলতায় মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা
সম্প্রতি এক শিক্ষার্থী সাপের কামড়ের শিকার হওয়ায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য মানুষের নিরাপত্তা। একই সঙ্গে সাপও পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সাপ না মেরে উদ্ধার করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসের বনাঞ্চল সংরক্ষণ, হলের কক্ষ পরিষ্কার রাখা, নিচতলার জানালায় নেট লাগানো এবং ড্রেনে সাপের প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তবে নির্বিচারে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা ঠিক নয়। আর কার্বলিক অ্যাসিড সাপ তাড়াতে পারে না।”
এদিকে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ১৩৮ নম্বর কক্ষ থেকে প্রায় তিন ফুট লম্বা একটি বিষধর কালাচ সাপ উদ্ধার করা হয়। এর আগে সাপটির কামড়ে ওই কক্ষের এক শিক্ষার্থী আহত হন। এ ঘটনায় আবাসিক হলগুলোতে সাপের উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হলে সাপের উপস্থিতি আমাদের মধ্যে বেশ আতঙ্ক তৈরি করেছে উল্লেখ করে আবাসিক শিক্ষার্থী মো রেজওয়ান ইসলাম বলেন, রাতে রুম থেকে বের হওয়া বা বাথরুমে যাওয়ার সময় ভয় লাগে। কয়েকদিন আগে একটি রুমে সাপ ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। আমরা চাই, হলের আশপাশের ঝোপঝাড় ও নোংরা জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হোক এবং জানালায় নেট লাগানোসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক অনেকটাই কমবে।’
সাপের আবাসস্থল ও মানুষের সঙ্গে সংঘাতের বৈজ্ঞানিক কারণ জানতে চাইলে রাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো সাইফুল ইসলাম ফারুকী আরটিভিকে বলেন, ‘বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল ডুবে যায়। এ ছাড়া মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় সাপ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসতে পারে। ক্যাম্পাসে জলাশয়, ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চল থাকায় সাপের জন্য উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে তা মেরে ফেলা উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের সাপ সম্পর্কে সচেতন করতে সেমিনার আয়োজনের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সাপের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি। সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।’
এদিকে, ক্যাম্পাসে সাপের উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান আরটিভিকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসন আগে থেকেই কাজ করছে। হলগুলোর আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং জানালায় নেট লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় কাজ চলমান থাকতেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। এ ঘটনার পর সব হলকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাপের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত ইঁদুরসহ অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
রাবি মেডিকেল সেন্টারে অ্যান্টিভেনম রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে কিছু চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। তবে সাপে কাটার ঘটনায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।”





