ভারত মহাসাগরের নতুন করিডর: ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ

Any Akter
এম এ মতিন
প্রকাশিত: ৩:৪৫ অপরাহ্ন, ১০ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫২ অপরাহ্ন, ১০ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্বরাজনীতিতে এমন কিছু প্রকল্প থাকে, যেগুলোকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প বললে ভুল হবে। এগুলো মূলত ভবিষ্যৎ বিশ্বের ক্ষমতার মানচিত্র পুনর্লিখনের নকশা। চীনের চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (CMEC) ঠিক তেমনই একটি প্রকল্প। এটি শুধু একটি সড়ক, রেললাইন, পাইপলাইন বা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নয়; বরং ভারত মহাসাগরে স্থায়ী কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর আজ আর শুধু মিয়ানমারের একটি বন্দর নয়; এটি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই মিলিত হয়েছে চীনের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন: মরণফাঁদ অটোরিকশা এখনই কঠোর নিয়ন্ত্রণ চাই

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও চীনের একটি মৌলিক কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে। তাদের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই সংকীর্ণ জলপথে কোনো সামরিক উত্তেজনা বা আন্তর্জাতিক অবরোধ সৃষ্টি হলে চীনের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে “মালাক্কা ডিলেমা” হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর সেই দুর্বলতার বিকল্প ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সমঝোতা: মুসলিম বিশ্বের পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির সূচনা?

কুনমিং থেকে মুসে, মান্দালয় হয়ে কিয়াউকফিউ পর্যন্ত বিস্তৃত এই করিডরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগর সরাসরি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হবে। ইতোমধ্যেই তেল ও গ্যাস পাইপলাইন চালু হয়েছে। পরিকল্পনায় রয়েছে আধুনিক রেলপথ, এক্সপ্রেসওয়ে, শিল্পাঞ্চল এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। অর্থাৎ এটি এমন একটি অবকাঠামো, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে একই সঙ্গে শক্তিশালী করবে।

এ কারণেই এই প্রকল্পকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাস্তবতা ধরা পড়বে না। এটি মূলত একটি ভূরাজনৈতিক বিনিয়োগ।

অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্য এই করিডর একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত দেশটির জন্য চীনের বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ বিদেশি প্রভাবের আওতায় চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

আরও বড় বাস্তবতা হলো, করিডরের উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। রাখাইন, শান ও উত্তর মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো জান্তা সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে চলমান সংঘর্ষ করিডরের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। চীন যতই বিনিয়োগ করুক না কেন, নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কোনো করিডর দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না।

ঠিক এই সময়ে চীন বাংলাদেশকে যুক্ত করে একটি চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর (CMBEC) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

এই প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা।

যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে পরিণত হতে পারে। ইউনান প্রদেশের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের সরাসরি প্রবেশাধিকার সৃষ্টি হবে। ট্রানজিট, লজিস্টিকস, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশের পরিবহন অবকাঠামোও নতুন মাত্রা পাবে।

কিন্তু অর্থনৈতিক লাভের হিসাবের পাশাপাশি নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং সার্বভৌম স্বার্থের সমীকরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা সংকট এখনো অমীমাংসিত। মিয়ানমারের সীমান্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। ভারত এই করিডরকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কোয়াডভুক্ত দেশগুলোও চীনের সম্প্রসারণবাদী প্রভাব মোকাবিলায় সক্রিয়।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা করা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি কৌশলগত নির্ভরতা নয়।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা অবশ্যই বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে।

বিশ্বের অনেক দেশ চীনা অর্থায়নের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নিয়ে পরবর্তীতে ঋণের চাপ, চুক্তিগত অসাম্য এবং কৌশলগত নির্ভরতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। যদিও প্রতিটি দেশের বাস্তবতা ভিন্ন, তবুও বাংলাদেশকে প্রতিটি চুক্তি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক লাভ যদি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক মূল্য দাবি করে, তবে সেই লাভ প্রকৃত অর্থে লাভ নয়।

একই সঙ্গে ভারতকেও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে যে, বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে। ঢাকা কোনো শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার নয়। বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত আগে জাতীয় স্বার্থ যেখানে সর্বাধিক সুরক্ষিত হবে, সেখানেই অংশীদারিত্ব।

আজকের বিশ্বে করিডর মানেই শুধু বাণিজ্য নয়; করিডর মানে প্রভাব, করিডর মানে নিরাপত্তা, করিডর মানে ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি।

বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই অবস্থান আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদের মূল্য তখনই থাকবে, যখন আমরা সেটিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করব।

চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। তবে সেই জানালা দিয়ে প্রবেশের আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে,জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকবে, রোহিঙ্গা সমস্যার বাস্তব অগ্রগতি হবে, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হবে না এবং অর্থনৈতিক লাভের সুফল দেশের মানুষ পাবে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের স্থান নেই; সেখানে প্রয়োজন দূরদর্শিতা। কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; আছে কেবল স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ।

বাংলাদেশ যদি সেই নীতিতে অটল থাকতে পারে, তবে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডর আমাদের জন্য নতুন সমৃদ্ধির সেতু হতে পারে। আর যদি দূরদর্শিতা হারিয়ে ফেলি, তবে এই একই করিডর একদিন আমাদের ভূরাজনৈতিক জটিলতার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হতে পারে। সিদ্ধান্ত আমাদের। ইতিহাসও আমাদের সিদ্ধান্তেরই সাক্ষী হয়ে থাকবে।