চবিতে র‍্যাগিংয়ের প্রতিবাদ করায় সংঘর্ষ, লাঠির আঘাতে ভাঙল শিক্ষার্থীর হাত

Sanchoy Biswas
মো. সাবিত বিন নাছিম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৪৫ অপরাহ্ন, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫১ পূর্বাহ্ন, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) র‍্যাগিংকে কেন্দ্র করে ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইতিহাস বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাশরাফি মুনওয়ার মাহীর বাম হাত ভেঙে গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

গত ৯ আগস্ট বেলা আনুমানিক ১১টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারবিষয়ক একটি অনুষ্ঠান চলছিল। অডিটোরিয়ামের ফাঁকা আসনে ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী বসেন। তাঁদের পাশে দর্শন বিভাগের কয়েকজন ছাত্রী বসেছিলেন। এ সময় দর্শন বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের সিনিয়র পরিচয়ে র‍্যাগিং করেন।

আরও পড়ুন: গণমাধ্যম ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সংযোগ জোরদারে ঢাবি-ঢাকা ডক্ল্যাবের সমঝোতা

র‍্যাগিংয়ের বিষয়টি জানতে পেরে ইতিহাস বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে যান। তাঁদের মধ্যে একজন জানতে পারেন, র‍্যাগিং করা শিক্ষার্থীরা দর্শন বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের। তিনি দর্শন বিভাগের ওই শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের জন্য ক্ষমা চাইতে বলেন এবং এ ধরনের আচরণ ঠিক হয়নি বলে জানান। দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পাল্টা বলেন, ‘কিছুই বলব না, তোদের কী করার আছে কর।’

এরপরই দর্শন ও ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে দর্শন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীরা তাঁদের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ইমিডিয়েট সিনিয়রদের ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন। পরে দুই বিভাগের ইমিডিয়েট সিনিয়রদের মধ্যেও সংঘর্ষ শুরু হয়।

আরও পড়ুন: ইবি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, হল শাখার ওয়াকআউট ও উদ্বেগ

সংঘর্ষের খবর পেয়ে ইতিহাস বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাশরাফি মুনওয়ার মাহী ও রাকিবুল ঘটনাস্থলে যান। সেখানে দর্শন বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের অনেক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। একপর্যায়ে কয়েকজন মিলে মাহিকে মারধর করেন। পরে দর্শন বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম একটি শক্ত কাঠের লাঠি দিয়ে মাহীর শরীরে আঘাত করেন।

লাঠির আঘাতে মাহী গুরুতর আহত হয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর বাম হাতের হাড় ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার আগে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিয়ে কথোপকথন হয়। ফাহিম (২৪-২৫) নামের একজন জুনিয়রদের উদ্দেশে লেখেন, "হিস্ট্রির সাথে কথা বলা হয়েছে, যতটুকু বুঝেছি ওরা মিউচুয়ালে যাবে না সহজে। তাই সন্ধ্যায় সবাই নিজেদের মতো মানসিক এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আসিস।" একই গ্রুপে নাইম (২৪-২৫) নামের একজন সবাইকে উপস্থিত থাকার কড়া তাগিদ দেন।

সংঘর্ষের পর একই গ্রুপে হামলার বিষয়েও বার্তা আদান-প্রদান হয়। দর্শন বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ওয়াসিম, যিনি মেসেঞ্জারে ‘আবনিব’ নামে পরিচিত, একটি বার্তায় লেখেন, "আমরা ওদের যথেষ্ট মারছি। একজন সিএমসি তে আছে। ওদের ২৫-২৬ এর কেউ যদি কোনো বিষয়ে কথা বলে তাহলে তোরাও রিয়েক্ট করবি।"

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘর্ষের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে একই গ্রুপে সেটি নিয়েও আলোচনা হয়। শাকিল (২৪-২৫) নামের একজন ভিডিওটি যেন ভুল করেও কারও কাছে চলে না যায়, সে বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সংঘর্ষের সময় দর্শন বিভাগের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের আরিফ, সাজিদ, জাহিদ এবং ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের তানভীর, সামিউল ও লতিফসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। সংঘর্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি ও ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট মেসেঞ্জার কথোপকথনের স্ক্রিনশট ঘটনাটির সঙ্গে সম্পর্কিত নথি হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

ঘটনার পর ১১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন মাশরাফি মুনওয়ার মাহী। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ওয়াসিম তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে তাঁর বাম হাত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং তাঁর স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অভিযোগপত্রের সঙ্গে মাহী প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ছবি, ভিডিও, এক্স-রে রিপোর্ট ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি প্রশাসনের কাছে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে ওয়াসিমকে শনাক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের দাবি জানান তিনি।

লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর মাহীকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

এ ঘটনায় র‍্যাগিংয়ের সূত্র ধরে প্রথমে নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পরে ইমিডিয়েট সিনিয়রদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে একজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ওয়াসিমের সঙ্গে যেকোনোভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।