ডেঙ্গু ও হামের চিকিৎসায় সর্বশান্ত হচ্ছে নিম্নবিত্তরা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:৪৮ অপরাহ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪৮ অপরাহ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৯৪৮
  • ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ জনের মৃত্যু
  • পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ,আর্থিক টানাপোড়েন, রোগীর চাপ
  • সরকারি হাসপাতালে ব্যয় ১২ হাজার, ঢাকার বাইরে থেকে আসা ৩৫ হাজার টাকা
  • চিকিৎসা পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতায় চাকরি যাওয়ার ঝুঁকিতে শ্রমিকরা

দেশজুড়ে প্রাণঘাতি রোগ ডেঙ্গু ও হামের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এই রোগের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সর্বশান্ত হয়ে পড়ছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষ। এই রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত ও হাসপাতালের অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে। কারও কারও সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে একদিকে হিমশিম খাচ্ছেন,অন্যদিকে সর্বশান্ত হচ্ছেন নিন্মবিত্ত আয়ের মানুষ।

জানা গেছে, দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে একসঙ্গে তিনটি চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, অন্যদিকে কয়েক মাস ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব এখনো থামেনি। এর সঙ্গে হাম আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বর্তমানে হাসপাতালগুলোকে একই সময়ে ভিন্ন বয়স ও ভিন্ন ধরনের রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,১০৮ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১,০০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশে মোট ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৯,৬২০ জন।

আরও পড়ুন: প্রাণহানি দাঁড়াল ২৩৯ জনে

স্বল্প আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের একজন সদস্য অসুস্থ হলে দৈনন্দিন আয়ের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী পরিবারের ক্ষেত্রে অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মক্ষম একজনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে অনেক রোগীকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার খরচও যোগ হয়। অন্যদিকে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় ওষুধের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং যাতায়াত ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও রোগীর চাপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন এবং ওষুধের বাড়তি খরচের কারণে তাদের আর্থিক সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিচ্ছে। তবে স্বল্প আয়ের মানুষের দাবি, রোগের চিকিৎসা যেন পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ না হয়, সে জন্য সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে বা ভর্তুকিমূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে হাম প্রতিরোধে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ২৯ দিনে ১৪২ জনের মৃত্যু

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় একজন রোগীর ব্যয় হচ্ছে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা, আর ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এ ব্যয় লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া চিকিৎসার সময় ও চিকিৎসা পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতায় কাজ করতে না পারায় চাকরি যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন কারখানা শ্রমিক থেকে শুরু করে নিম্নবিত্তরা। নারায়ণগঞ্জের অপু শিকদার গেল এক সপ্তাহ ধরে লড়ছেন ডেঙ্গুর সঙ্গে। নারায়ণগঞ্জের দুই হাসপাতালে চিকিৎসায় উন্নতি না হওয়ায় এসেছেন ঢাকা মেডিকেলে। পেশায় গার্মেন্টস কর্মী অপু শিকদারের এরমধ্যেই খরচ হয়েছে অন্তত ২৫ হাজার টাকা। শেষ পর্যন্ত এ খরচ কততে গিয়ে ঠেকে, তা অনিশ্চিত। তবে এই ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থা পুরো পরিবারের। অপু শিকদারের স্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ধরেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা গেছে। আর বাসা পর্যন্ত যাইতে যাইতে ৩০ হাজার টাকার ওপরে যাবে।

ঢাকা মেডিকেলের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি বেশ কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমেই যারা সরাসরি সরকারি মেডিকেলে এসেছেন, তাদের খরচ হয়েছে অন্তত ১২ থেকে ১৫ হাজার। ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এ খরচ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার। সরকারি হাসপাতালে স্যালাইন, প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বিনামূল্যে পেলেও খরচ হয় খাবার, যাতায়াত, বিভিন্ন পরীক্ষায়। রোগীদের মধ্যে একজন বলেন, যে রক্তের প্লাটিলেটটা তো অনেক কমে যায়। ওইটা আরকি দেখার জন্য প্রতিদিন সিবিসি করা লাগে। অন্য একজন বলেন, এই পর্যন্ত গাড়ি-ঘোড়া ভাড়া দিয়ে মনে করেন দেখা গেছে যে আমার ১৫-১৬ গেছে আরকি।

ঢাকা মেডিকেল প্রশাসনের তথ্যমতে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে ভর্তি ২৫০ ডেঙ্গু রোগী। চিকিৎসায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি আছে বলেও দাবি তাদের। কথা হয় ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ এর সঙ্গে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট মানে কর্তৃপক্ষ সজাগ। ম্যানেজমেন্ট মানে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রিপেয়ার্ড। তিনটা ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড করা হয়েছে। পেশেন্ট আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো সাপোর্ট পাচ্ছে। কোনো সংকট এই মুহূর্তে তেমন নাই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, বেসরকারি বি ক্যাটাগরির হাসপাতালে খরচ অন্তত ৫০ হাজার। প্রথম শ্রেণির হাসপাতালে সেটি কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিরোধযোগ্য এমন ব্যয়ে বাড়তি বোঝা তৈরি করছে সাধারণ মানুষের। কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাইরে থেকে রোগী যদি আসে, তাহলে তাদের আসা-যাওয়া, থাকা, অ্যাটেনডেন্টের খরচ—এগুলো বেড়ে যায়। এ ক্যাটাগরি হাসপাতালে তাহলে তো এক লাখের ওপরে যেত। এটা থেকে বড় জিনিস যেটা, সেটা হচ্ছে যে তিন-চার দিনে জ্বরে একটা মানুষ মারা যাবে, এটা তো কোনো সভ্য সমাজের জন্য মেনে নেয়াটা কঠিন, তাই না? এটা যদি হতো যে এটাকে প্রিভেন্ট করা যাচ্ছে না, যেকোনো প্রিভেন্টের উপায় নাই, আমরা অসহায় হয়ে গেছি, তাহলে এক কথা ছিল। সেটা তো না। চিকিৎসায় সরাসরি ব্যয়ের সঙ্গে কাজে অনুপস্থিতি, সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় শারীরিক দুর্বলতা, এমনকি পুরো পরিবার রোগীর সঙ্গে থাকায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের। বাড়তি আর্থিক বোঝা বছরজুড়ে বয়ে নিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।