প্রাণহানি দাঁড়াল ২৩৯ জনে
মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি হচ্ছে। তবে রোগী বাড়লেও সংকট কাটছে না চিকিৎসা ব্যবস্থায়। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ২৩৯ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৯৪২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একজন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন ও রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) তিনজনের প্রাণহানি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) সবচেয়ে বেশি ৩৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি এই সময়ে খুলনা বিভাগে ২৬৪ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০১, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৯, বরিশাল বিভাগে ২১৩, রাজশাহী বিভাগে ১৭৯, ময়মনসিংহ বিভাগে ১২০, রংপুর বিভাগে ৫৬ ও সিলেট বিভাগে ৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ২৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ১১৩ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৪৫ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ২০, বরিশাল বিভাগে ১৮, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪ জন, রংপুরে ৫ জন ও সিলেট বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে ২৯ দিনে ১৪২ জনের মৃত্যু
এদিকে, মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে তছনছ করে দিয়েছে চিকিৎসক আঁচল রায় ও জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) স্বামী বিপ্লবের সংসার। খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা-বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনেছিলেন দুজনে মিলে। এরপর বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর পরিকল্পনাও ছিল চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়ের। সেই সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না আঁচলের। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হন তিনি। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। স্বামী বিপ্লবও পাশে থেকে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁকে আর ফেরানো যায়নি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল। বিয়ের ছবি-ভিডিও, স্বামীর সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরতে যাওয়ার ছবি আর নিজের পেশাগত জীবনের নানা অর্জনের স্মৃতি এখনো আঁচলের ফেসবুকজুড়ে। সেসব ছবির মানুষটি আর নেই। আছে খিলগাঁওয়ের সেই বাসা, কেনা কিছু জিনিস আর দুজনে মিলে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ঘটা করে বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। এর তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক। চাকরি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেরই ব্যস্ততা ছিল। বিয়ের পর নিয়মিত এক ছাদের নিচে থাকা হয়নি তাঁদের। চাকরির কারণে আঁচল ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, বিপ্লব জামালপুরে। পরে একজন ঢাকায়, আর অন্যজন বরগুনায়। ছুটি পেলে কিংবা ঢাকায় কাজ থাকলে দেখা হতো। সেই অল্প সময়েই চলত সংসারের হিসাব। কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন, কবে দুজন একসঙ্গে থাকবেন—এসব নিয়েই ছিল তাঁদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কথা হয় আঁচলের স্বামী বিপ্লব এর সঙ্গে। তিনি জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বরগুনার বেতাগী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি ৪৫তম বিসিএসে (স্বাস্থ্য ক্যাডার) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু তাঁদের সংসারটাও গোছানোর সময় দিল না।





