আইসিটি মামলায় জামিনের নামে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবি
বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্তের দাবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) একটি মামলায় কারাবন্দী সাবেক সংসদ সদস্যকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার নামে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রকাশের পর বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিতের পথকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এ ঘটনা আইন পেশার গভীর সংকট ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের অভিযোগ জড়িত হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর জনসাধারণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
আরও পড়ুন: পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৪ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলো
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আসামি চট্টগ্রাম-৬ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন সদ্য পদত্যাগ করা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার।
হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে এ ধরনের ঘুষ দাবির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। রেকর্ডিংগুলো সংগ্রহ করে যাচাই করেছে প্রথম আলো ও নেত্র নিউজ। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার দুই গণমাধ্যমের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: গণভোটের আগে সংসদ-সংবিধান সংস্কারে আলোচনার পথেই সিদ্ধান্ত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এ ঘটনায় বর্তমান আইনমন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক ও বর্তমান চিফ প্রসিকিউটরদের দৃশ্যমান নমনীয়তা এবং কঠোর অবস্থান না নেওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এমন এক সময়ে এ ধরনের উদাসীনতা প্রশ্নের জন্ম দেয়, যখন নতুন সরকার দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারের কথা বলেই ক্ষমতায় এসেছে। ফলে উচ্চপর্যায়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশের পর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অভিযোগটি তদন্তে তাঁদের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু করা হবে।
তবে শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্ত যথেষ্ট নয় বলে মত দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যোগসাজশমূলক দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আইন পেশাসহ সব পেশাজীবী মহলে কঠোর বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, অভিযুক্ত প্রসিকিউটর শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার অজুহাতে পদত্যাগ করলেই এ ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত এবং এতে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসন পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে নতুন সরকার গঠনের পর সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাবের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং জনমনে হতাশা তৈরি হবে। এতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে দুর্নীতিপুষ্ট চোরতান্ত্রিক গোষ্ঠী ও সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।





