হঠাৎ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
দিন-দুপুরে গোলাগুলি, খুন হচ্ছে একের পর এক; বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক
রাজধানীসহ সারাদেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছে না খুন, গুলিবর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, শিশু নির্যাতন এবং গণপিটুনির ঘটনায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। চট্টগ্রাম থেকে খুলনা, ঢাকা থেকে সীমান্তবর্তী জনপদ—বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট, দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাওয়ার মতো কারণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার হলেও সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
আরও পড়ুন: ওয়ারীতে ৫৭ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই: আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের আরও ৩ সদস্য গ্রেফতার
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে চট্টগ্রামের রাউজানে। রোববার দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। তিনি রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ স্বপনের ছোট ভাই।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাসুদুল হক। এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পাঁচ থেকে সাতজন অস্ত্রধারী এসে তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
আরও পড়ুন: ইট ছুড়ে মোটরসাইকেল আরোহীকে আহতের ঘটনায় গ্রেফতার ২
পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, বালুর ব্যবসা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাসুদুল হক।
রাউজানে রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে উপজেলাটিতে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।
চট্টগ্রামেই আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে আনোয়ারা উপজেলায়। শনিবার গভীর রাতে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি এলাকায় নিজ বাড়িতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এনি বড়ুয়া (৪০) ও তার মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)-কে।
পুলিশ জানিয়েছে, অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা ঘরে ঢুকে মা ও মেয়ের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে পথে মৃত্যু হয়। প্রাথমিক তদন্তে নিহত নারীর স্বামীর সঙ্গে এক আত্মীয়ের আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ বলছে, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
খুলনাতেও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নগরীর লবণচরা থানার কাজীপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে রফিকুল ইসলাম ওরফে ঢাকাইয়া রফিক নামে এক বিএনপি কর্মীকে। স্থানীয়ভাবে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ব্যস্ত বাজার এলাকায় সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
এর আগে খুলনা মহানগরের দৌলতপুর থানার একটি মসজিদে ফজরের নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াত করার সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন লোকমান হাকিম নামে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে গুলিবর্ষণের ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১১৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার বহু ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর শিরশ্ছেদ করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। শিশুদের বিরুদ্ধে এমন বর্বরতা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো গণপিটুনির ঘটনা। চুরি, সন্দেহভাজন অপরাধ কিংবা গুজবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতারও ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন উঠেছে, যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান থাকার পরও কেন এমন একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে?
এ বিষয়ে রোববার বাংলাবাজার পত্রিকাকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, “কয়েক বছর ধরে দেশের মানুষের নীতি-নৈতিকতা নেই বললেই চলে। বর্তমানে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের সম্মান করা হয় না। এতে করে সামাজিক দায়বদ্ধতা কমে গেছে। আর পাঁচ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন সরকারের সময় পুলিশকে গোছানোর চেষ্টা করা হলেও তারা এখনো পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী ঘটনাগুলোতে পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ বিচার কিংবা সঠিক তথ্য সামনে আসেনি। এসব কারণেও বাহিনীটি দৃঢ় অবস্থানে ফিরতে পারেনি বলে মনে হয়। দেশের যেসব রাজনৈতিক দলের সামাজিক প্রভাব রয়েছে, তাদের সবাইকে নিয়ে জাতীয় সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করাও প্রয়োজন।”
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনও।
বাংলাবাজার পত্রিকাকে তিনি বলেন, “পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশ বাহিনীর কাঙ্ক্ষিত পুনর্গঠন হয়নি। এছাড়া এখনো কিছু ক্ষেত্রে মব জাস্টিস বা গণবিচারের প্রবণতা দেখা যায়।আবার যে কোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক হয়ে পড়ে।” এদিকে সম্প্রতি মাঠ থেকে সেনাবাহিনীও ব্যারাকে ফিরছে, এতে সন্ত্রাসীরা আরো বেপরোয়া হওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পুনর্গঠন বা রিমডেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অপরাধের ধরন বহুমাত্রিক। কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে হামলা হচ্ছে, কোথাও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, আবার কোথাও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধ প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, মাদক ব্যবসা, অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান টহল বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি কঠিন হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনেও রাষ্ট্র, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, যৌথ বাহিনীর অভিযান চললেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রকাশ্যে গুলি, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, নারী-শিশুর ওপর নৃশংসতা এবং গণপিটুনির ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।





