বাণিজ্য সচিব নিয়ে হচ্ছেটা কী!
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে দৃঢ়তার অভাবে জনপ্রশাসনে তদবিরের চাপে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে সচিববিহীন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়ে রুটিন কাজের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। রুটিন দায়িত্ব পালন করা বিগত স্বৈরাচারী আমলে পদোন্নতি পাওয়া অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খানকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলেও তিনি যোগদান করছেন না। বারবার ঘুরেফিরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদটি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই আলোচনায় আসে। এই পদে নিয়োগের জন্য এ সময়ে অনেক দর-কষাকষি করতে গিয়ে বেশ কিছুদিন শূন্য ছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগ করা হয়। সে সময় তদবির পার্টির সঙ্গে মাহবুবুর রহমানের ৫০ কোটি টাকার চুক্তিপত্র, পরবর্তীতে ৫০০ কোটি টাকার চুক্তিপত্র বিভিন্ন সামাজিক ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সেটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান গত ১৭ এপ্রিল ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আরও পড়ুন: ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, দায় আগের সরকারের নীতির: বাণিজ্যমন্ত্রী
তারপর থেকে প্রায় দুই মাস মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদটি শূন্য। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। এবারও এই পদে পদায়ন নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সচিবদের তদবিরের চাপে অবশেষে ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, বিসিএস ১৮ ব্যাচের নিয়মিত কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান খানকে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
ঈদের ছুটির কারণে তিনি যোগদান করতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তীতে ঈদের ছুটি শেষে প্রথম কার্যদিবস গতকাল সোবার সকালে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বাণিজ্য সচিব মন্ত্রণালয়ে গিয়ে যোগদানপত্র দাখিল করেন। কিন্তু রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব তাকে দায়িত্ব প্রদান করেননি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি চারতলায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দপ্তরে গিয়ে যোগদানপত্র দাখিল করে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
আরও পড়ুন: আইজিপির সঙ্গে ইউএনডিপি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ
জানা যায়, এ সময় মন্ত্রী তার যোগদানপত্র অনুমোদন না করে অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব মন্ত্রীর দপ্তর থেকে আর সচিবের দপ্তরে দায়িত্ব নিতে যাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সোমবারও সচিবের পদটি শূন্য রয়েছে। রুটিন দায়িত্বে থাকা আলোচিত অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খান তার পদায়নকৃত শ্রম মন্ত্রণালয়ে যোগদান না করে রুটিন দায়িত্বের পদটি ধরে রেখেছেন।
তবে পর্দার আড়ালে বাণিজ্য সচিবের পদ নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, মোট অঙ্কের অর্থ লেনদেন, তদবির পার্টির সঙ্গে শত শত কোটি টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তিপত্রের অভিযোগও রয়েছে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সচিব নিয়োগে প্রশাসনে অনেকটা স্থবিরতা দেখা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক অতি বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়েও তীব্র সমালোচনা হয়। তবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ দিতে দীর্ঘ সময় লাগে।
মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার নিয়মিত দেশের কর্মকর্তা ও অতীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা আতাউর রহমান খানকে বাণিজ্য সচিব পদে নিয়োগ দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করে নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে সফলতার কারণে সরকারের নীতিনির্ধারকরা তাকে বাছাই করেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশি-বিদেশি কার্যক্রমে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট তাদের মধ্য থেকে একজনকে সচিব করতে মন্ত্রীকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছে।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সেবা গ্রহণকারী ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাকারী এ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন সচিব পদ শূন্য থাকায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দপ্তরে দপ্তরে জমেছে ফাইলের স্তুপ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একই সঙ্গে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় কার্যক্রমেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সহায়তা কার্যক্রম ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও বাণিজ্য সচিব নিয়োগে সিদ্ধান্তহীনতা কেন? এই মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ নিয়ে তদবিরের চাপ কার স্বার্থে? সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও বাস্তবায়নে অদৃশ্য শক্তির উৎস কী? জনপ্রশাসনের দীর্ঘদিনের নিয়োগ-তদবির বাণিজ্যের এই অপবাদের শেষ কোথায়?





