বিতর্কিতদের লাগাম টানছেন তারেক রহমান
- শৃঙ্খলা ফেরাতে দল ও সরকারে কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী
- আইনশৃঙ্খলায় বিশেষ অভিযানের চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার
- রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করলেন মিষ্টি
- ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে, কারো সম্পৃক্ততা পেলে ছাড় দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ আসনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয় লাভ করে বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে ক্ষমতায় আসার পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে তৃণমূল থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে চাঁদাবাজি-দখল, হামলা, ভাঙচুর ও নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে নেতাকর্মীরা। বার বার হুসিয়ারি দিয়ে থামানো যায়নি বেপরোয়া নেতাকর্মীদের। এবার দল ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একইসঙ্গে প্রশাসন, দলীয় সংগঠন-সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বে অবহেলা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার জন্য কঠোর বার্তাও দেওয়া হয়েছে। এককথায় বলতে গেলে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনায় দলে থাকা বিতর্কিত নেতাদের লাগাম টানছেন তারেক রহমান।
আরও পড়ুন: বিডিনিউজের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন
দলীয় ও সরকারি সূত্র বলছে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের ভেতরের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সরকার গঠনের পর দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ বাড়তে থাকায় দলের ভাবমর্যাদা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে তৃণমূল থেকে অভিযোগ সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। সবশেষ মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে স্পিকার তার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। পরে সংসদ সচিবালয় সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সমিতির সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।
গত বুধবার রাতে ৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে গঠিত কমিটির পরিবর্তে শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। একই রাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও একই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।
আরও পড়ুন: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছাড় দিচ্ছে না ডেঙ্গু
ফলে গত ৫ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর দর্শনা পৌর যুবদলের সদস্য রাকিবুল হাসান ব্রাইটকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর কৃষক দলের সদস্য সচিব সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সলকে পদ্মা অয়েল ডিপোর কর্মীদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে ২১ জুন চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে পুলিশ আটক করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় যুবদল থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে। সার কারখানাগুলোর অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া, ভুল রফতানি নীতি এবং দেশজুড়ে কৃষক নিহত হওয়ার নৈতিক দায় ও প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ওই বছরের ৪ এপ্রিল শিল্পমন্ত্রী এ এম জহিরুদ্দিন খানকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সংকট মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থতার কারণেই জহিরুদ্দিনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দলের অন্য নেতা-কর্মী এবং এমপিদেরও সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যালোচনায় কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি চোখে পড়েছে। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কেন্দ্রের সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দলীয় পর্যায়েও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দলের বিভিন্ন স্তরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্যের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে চলা, দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে দলীয় নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক সংগঠনে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও তা যেন সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সরকারের কয়েকজন নীতিনির্ধারক মনে করছেন, প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের পর্যায়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ কারণে মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও দলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হয়। তবে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে দলীয় বিশৃঙ্খলার দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সরকার গঠনের পরও দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসছে। এতে সরকারের ভালো কাজগুলোও বিতর্কিত হচ্ছে বলে দলের নেতারা মনে করছেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, গুটিকয়েক ব্যক্তির অপরাধের দায় বিএনপি নেবে না। দলীয় আদর্শের বাইরে গিয়ে কেউ কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। যারা সরকার ও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।





