ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ
‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু, এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু!’— আমাদের জাতীয় জীবনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব বিদ্রোহী কবির ধূমকেতুর মতোই। আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস।
১৯৭৫ সালের এই দিনে সমগ্র জাতি যখন আধিপত্যবাদী চক্রের ষড়যন্ত্রে অনিশ্চয়তার সম্মুখীন, তখন সিপাহিজনতার মিলিত বিপ্লব জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনে সিপাহি-জনতা তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। ষড়যন্ত্রের অমানিশার অন্ধকারে ধুমকেতুর মতোই আবারও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্থান আমাদের জাতীয় জীবনে দেশপ্রেমিক বীর সেনানির ভূমিকায়। তিনি ক্রান্তিময় সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশে প্রবর্তন করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। সূচনা করেন উন্নয়ন ও উতপাদনের নবধারার রাজনীতি।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে আইকাওয়ের এভিয়েশন সিকিউরিটি অডিট সম্পন্ন, নিরাপত্তাব্যবস্থায় সন্তুষ্ট অডিট দল
স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে অমানিশার অন্ধকারে আবারও আবির্ভাব সেই প্রিয় কণ্ঠ আমি মেজর জিয়া বলছি। তবে এবার মেজর নয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। দেশের মানুষ সেই আশা জাগানিয়া কণ্ঠে ৭ নভেম্বর প্রত্যুষে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল সিপাহী জনতার ঐক্যবদ্ধ সংহতিতে। তাই ৭ নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্য ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত দিন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ পালটা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। বন্দী করা হয়েছিল সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। চার দিকে ষড়যন্ত্রের ঘনঘটা ও আকাশে ভারতীয় হেলিকপ্টারের মহড়া দেশের শাসনব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল। তখন দেশপ্রেমিক সৈনিক ও জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে খালেদ মোশাররফের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রতিহত করে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে হেফাজত করেছিলেন। কিন্তু বিগত ১৭ বছর এই দিবসটিকে পালন করা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করেছিল সেই আধিপত্যবাদী শক্তিরই ক্রীড়নক সরকার।
আরও পড়ুন: কারাগারে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে ৭ দফা নির্দেশনা
আজ এমন এক মুহূর্তে জাতীয় বিপ্লব ও পসংহতি দিবস পালন করা হচ্ছে যখন ৭ নভেম্বরের নেতৃত্ব দেওয়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এবারই রাষ্ট্রীয়ভাবে ও বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগ ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করা হচ্ছে দিবসটি। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করবে দেশবাসী। বিএনপির শোভাযাত্রা নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান: এদিকে, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় শোভাযাত্রা করবে বিএনপি। আজ শনিবার আয়োজিত এ শোভাযাত্রায় উপস্থিত থাকবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন। তার উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শোভাযাত্রা শুরু হবে। শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির বিস্তারিত জানান দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি জানিয়েছেন, শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাছে গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবে। এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে রিজভী জানান, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপির ৭ দিনের কর্মসূচি গত ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আগামীকাল (আজ) দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলোচনা সভা, পোস্টার লাগানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের কর্মসূচি নিয়েছে।
রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটির রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করেছিল। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এত দিন দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দীর্ঘদিন পর আবারও রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ দিবস নিয়ে আগ্রহ ও আবেদন তৈরি হয়েছে। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারের নানা কর্মসূচি: অন্যদিকে, ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস-২০২৬’। যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহউদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পরিচালক) ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এই কর্মসূচিগুলো সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী প্রদান করবেন। দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি পালিত হবে এবং দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
এছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সব সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা দ্বারা সুসজ্জিত করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে সুবিধাজনক সময়ে দেশের সব মসজিদে মিলাদমাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়সমূহে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুকেন্দ্র, শিশু পরিবার, শিশুসদন, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র, শান্তি নিবাস ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
এতে বলা হয়, সব সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় দেশের সব শিশু পার্ক শিশুদের জন্য দিনব্যাপী বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য-সাময়িকী ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সিনেমা হল ও ভ্যানযোগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দেশাত্মবোধক গানের আসর, সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা এবং জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিশেষ স্মারক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সশস্ত্র বাহিনী কর্ত ৃক জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের তত্ত্বাবধানে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শিত হবে।
এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, এনটিএমসি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদর দপ্তরসমূহে মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হবে।





