জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছরেও বেরোবিতে নেই শহীদ আবু সাঈদের স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হতে চললেও তার স্মৃতিবিজড়িত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন। স্মৃতিস্তম্ভ, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কিংবা তার নামে ঘোষিত বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, সহযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’-এর পরিবর্তে ‘শহীদ আবু সাঈদ কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর ফটক বর্তমানে ‘শহীদ আবু সাঈদ গেট’ নামে পরিচিত। সেখানে একটি স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প স্থাপন করা হলেও তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে সেটি লাল কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন শিক্ষার্থীরা।
আরও পড়ুন: ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ
একই স্থানে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। সম্প্রতি গেট নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা করা হলেও এরপর আর কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি।
গত বছরের ১৬ জুলাই ‘শহীদ আবু সাঈদ দিবস’ উপলক্ষে শহীদের বাবা মকবুল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর ও স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প উদ্বোধন করেছিলেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। কিন্তু উদ্বোধনের পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
আরও পড়ুন: কাশিয়ানীতে গৃহবধূকে হত্যা: ১২ ঘণ্টায় স্বামী গ্রেপ্তার
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহৃত ও আগুনে পুড়ে যাওয়া কয়েকটি গাড়ি সংরক্ষণের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পেছনে টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এসব গাড়ি সংরক্ষণ করে একটি ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
এছাড়া শহীদ আবু সাঈদের নামে আবাসিক হল, জাদুঘর ও বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণের ঘোষণা থাকলেও সেগুলোর কোনোটি কার্যকর হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্যাম্পাসে আসা দর্শনার্থীরা শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতির কোনো উল্লেখযোগ্য স্থায়ী নিদর্শন খুঁজে পান না। আন্দোলনের সময় তার ব্যবহৃত রক্তমাখা টি-শার্ট, প্যান্টসহ গুরুত্বপূর্ণ স্মারকও সংরক্ষণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সাবেক সমন্বয়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম আশিকুর রহমান বলেন, "শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রায় দুই বছর পরও স্মৃতিস্তম্ভ ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের কাজ শুরু হয়নি। উদ্বোধনের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জুলাই আমাদের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও ইতিহাসের প্রতীক। তাই দ্রুত এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আগামী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি।"
আবু সাঈদের সহযোদ্ধা এবং ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম রহমান শাওন বলেন, "শহীদ আবু সাঈদ শুধু একটি নাম নন, তিনি জুলাই-২৪-এর প্রতিরোধের প্রতীক। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। অথচ তার স্মৃতিকে ধারণ করার মতো কোনো স্থায়ী অবকাঠামো এখনো নির্মিত হয়নি। পৃথক বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।"
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অলিউল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। শহীদ আবু সাঈদের ব্যক্তিগত স্মারক কিংবা আন্দোলনের বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শহীদ আবু সাঈদ গেট ও স্মৃতিস্তম্ভের কাজও দ্রুত শেষ করতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, শহীদ আবু সাঈদ গেট এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া গেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অতি শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। এছাড়া ক্যাম্পাসে থাকা ছাত্রলীগের ব্যবহৃত গাড়িগুলো বর্তমানে পুলিশের জিম্মায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের প্রত্যাশা, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণে আর বিলম্ব না করে দ্রুত স্মৃতিস্তম্ভ, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর এবং ঘোষিত অবকাঠামোগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।





