রংপুরে চার হত্যাকাণ্ড

রাত ২টা ৪০ মিনিটে বোনকে ফোন করেছিলেন নিহত প্রীতিলতা

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০২ অপরাহ্ন, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১২:০২ অপরাহ্ন, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বিবৃতির সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের একাধিক অমিল ও অসংগতি পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, ফরেনসিক আলামত ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনাটি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর আগে ২৪ ও ২৫ আগস্ট আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরে সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধান চালায়। এ সময় তারা নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবার, থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), মর্গসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেন।

আরও পড়ুন: সপরিবারে আত্মগোপনে থাকা চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু আটক

আসকের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টায় তার বোনের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা হয়। পরে রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে পূজার নম্বরে একটি কল আসে। তবে তিনি সে সময় কলটি ধরতে পারেননি।

অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ রাতে অভিযুক্তরা বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান। এরপর ভোরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

আরও পড়ুন: জানাজা শেষে নওগাঁর ৭ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর

এই পরিস্থিতিতে রাত ২টা ৪০ মিনিটের রহস্যজনক কলটি কে করেছিলেন, তখন ফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর পরিবারের সদস্যদের ফোনগুলো কখন বন্ধ হয়ে যায়—এসব বিষয় কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছে আসক। পুলিশের বর্ণিত সময়রেখার সঙ্গে ওই ফোনকলের সময়ের কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে চারজনকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে অভিযুক্তরা ওই বাসায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে খাবার খেয়েছিলেন বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আসক বলছে, এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষা জরুরি। অভিযুক্তরা যদি দীর্ঘ সময় ওই বাসায় অবস্থান করে খাবার খেয়ে থাকেন, তাহলে ঘরের আসবাব, রান্নাঘর, পাত্র, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ ও চুলের মতো জৈবিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।

হত্যাকাণ্ডের রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আশঙ্কার কথা বলা হলেও, ঠিক কখন, কীভাবে এবং কারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, তা প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে আসক।

তথ্যানুসন্ধানের সময় গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন আসক প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা তার ছেলেকে আটকের সময় পোশাক পরিবর্তন এবং ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারও প্রতিনিধিদলের কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন আসক প্রতিনিধিরা। মর্গের সহকারীরা মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের কথা জানালেও যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত দেখেননি বলে জানান।

তবে আসক জানিয়েছে, মর্গের কর্মীদের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন এবং নির্যাতনের বিষয়গুলো সিআইডির ল্যাব পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক রাসায়নিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব ধরনের আলামত যাচাই করা হচ্ছে।

আসকের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অনুমানের ওপর নির্ভর না করে ঘটনার প্রতিটি সূত্র নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে তদন্ত করা জরুরি।