ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক: বন্ধুত্ব চাই, আধিপত্য নয়

Any Akter
এম. এ. মতিন
প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩২ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভৌগোলিক নৈকট্য, অভিন্ন নদী, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশ একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল কূটনৈতিক মহলের আলোচনার বিষয় নয়; বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে গভীর অসন্তোষ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের ভারত সম্পর্কে বিরূপ মনোভাবকে কোনো একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, তিস্তা চুক্তির অমীমাংসিত থাকা, উজানে বাঁধ ও পানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা, ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটির সুফল-বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ - সবকিছু মিলিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ভিশন ও নেতৃত্বের সামনে বড় সংস্কারের পরীক্ষা

এর সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের কাছে ভারত এখন শুধু প্রতিবেশী নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার ভূমিকা নিয়েও একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি।

শেখ হাসিনা ও প্রত্যর্পণ প্রশ্ন

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি যখন শুধু পদ নয়, রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক

বর্তমান ঢাকা–দিল্লি টানাপড়েনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে এবং বিষয়টি এখন দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ভারতের নিজস্ব আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির কাঠামো অবশ্যই বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার মতো নয়।

বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডিত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যদি দীর্ঘদিন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অবস্থান করেন এবং বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর প্রত্যর্পণ দাবি করে, তাহলে এই বিষয়টি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, বিচারিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তার একটি স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

এখানে বাংলাদেশের দাবি কোনো প্রতিহিংসার দাবি হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দাবি। একইভাবে ভারতের কাছেও বাংলাদেশের প্রত্যাশা রয়েছে যে,রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে বিষয়টি স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ আইনি কাঠামোর মধ্যে নিষ্পত্তি করা।

আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় ও বিচার

ভারতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর অবস্থানও বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী এবং গুরুতর ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রমাণ এবং প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি পৃথকভাবে বিবেচনা করা দরকার।

কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া উচিত যে,গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি যেন কেবল রাজনৈতিক পরিচয় বা বিদেশে অবস্থানের কারণে বিচার এড়ানোর সুযোগ না পান।

ভারতের প্রতিও একই সঙ্গে একটি ন্যায্য প্রত্যাশা রয়েছে: বাংলাদেশ যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ চায়, সেসব অনুরোধ যেন রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাব না করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়।

হাদী হত্যাকাণ্ড: প্রত্যর্পণ এখন আস্থার পরীক্ষা

শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাংলাদেশ অভিযুক্তদের ফেরত চেয়েছে। এই ধরনের ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রত্যর্পণ কাঠামো কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

প্রত্যর্পণ চুক্তি কেবল একটি কাগুজে দলিল নয়। এটি দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থা, বিচারিক সহযোগিতা এবং আইনের শাসনের প্রতি সম্মানের বাস্তব পরীক্ষা।

বাংলাদেশের প্রত্যাশা খুবই স্বাভাবিক - যদি যথাযথ আইনি ভিত্তি ও প্রক্রিয়া পূরণ হয়, তাহলে অভিযুক্তদের দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার নিশ্চিত করা হবে।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এমন একটি সফর কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি, স্পষ্ট ও ফলপ্রসূ আলোচনার একটি সুযোগ।

একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে যাবেন, সেটি কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের সফর হতে পারে না। এটি হতে হবে দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমমর্যাদার প্রতিনিধিদের বৈঠক।

ঢাকার পক্ষ থেকে যেমন বন্ধুত্বের বার্তা থাকবে, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে।

ভারতের “খবরদারি” ও দাদাগিরির ধারণা

বাংলাদেশে ভারতের “খবরদারি” বা “দাদাগিরি” নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে ভারতের প্রভাব রয়েছে বলে এমন ধারণা বহুদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে।

বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

২০২৪ সালের গণআন্দোলন এই অসন্তোষের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছে।

কোনো স্বাধীন দেশের জনগণই এমন সম্পর্ক মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না, যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পছন্দ-অপছন্দ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধী রাষ্ট্রনীতি চায় না। তারা চায় ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক।

সীমান্ত: বন্ধুত্বের সঙ্গে প্রাণহানি বেমানান

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় উদ্বেগ। চোরাচালান, অবৈধ পারাপার ও সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশেরই নিরাপত্তাগত দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার নামে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের উচিত এমন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে অপরাধ দমন হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।

প্রতিটি প্রাণহানির স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

বন্ধুত্বের সম্পর্কের সীমান্তে বারবার লাশ পড়তে পারে না।

নদীর পানি: বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার

বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর পানির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

গঙ্গার পানি বণ্টন, তিস্তা চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানির প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশেষ করে তিস্তা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি ন্যায্য অধিকার, ন্যায্য হিস্যা এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের ন্যায়সংগততার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ করুণা চায় না।

বাংলাদেশ তার ন্যায্য অধিকার চায়।

টিপাইমুখ, বাঁধ ও উজানের পানি নিয়ন্ত্রণ

টিপাইমুখসহ উজানের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ বহুদিনের। উজানে বড় বাঁধ, পানি প্রত্যাহার কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তনকারী প্রকল্পের প্রভাব যে ভাটির দেশের ওপর পড়তে পারে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তাই যেকোনো আন্তঃসীমান্ত নদী প্রকল্পের ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময়, যৌথ সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং কার্যকর পরামর্শের ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।

উজানের ভৌগোলিক সুবিধা ভাটির দেশের ক্ষতি করার অধিকার তৈরি করে না।

নদী কোনো এক দেশের সম্পত্তি নয়; আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য ব্যবস্থাপনা দুই দেশের যৌথ দায়িত্ব।

রাস্তা, রেল, জলপথ ও ট্রানজিট

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বিরাট কৌশলগত সম্পদ। ভারত বাংলাদেশের সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর ব্যবহার করে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণ করতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশও এর মাধ্যমে রাজস্ব, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস ও অবকাঠামো উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের রাস্তা, রেল, নদী ও বন্দর ব্যবহারের বিনিময়ে যথাযথ রাজস্ব, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থ।

বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো বিনামূল্যের করিডোর নয়।

এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক সম্পদ।

বঙ্গোপসাগর: বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু স্থলভিত্তিক অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের বন্দর, সামুদ্রিক বাণিজ্য, মৎস্য, জ্বালানি, নীল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ সামুদ্রিক অবকাঠামোর উন্নয়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

তাই বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ভারতসহ চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

বাংলাদেশের সমুদ্র কোনো একক শক্তির প্রভাববলয়ের অংশ হতে পারে না।

বাংলাদেশের উন্নয়ন: নিজের শক্তিতে

বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।

শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর, কৃষি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।

ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অর্থনৈতিক অংশীদার থাকবে। কিন্তু ভারত যেন বাংলাদেশের একমাত্র অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক বা কৌশলগত নির্ভরতার কেন্দ্র হয়ে না ওঠে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য, ASEAN এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াবে।

এটি ভারতবিরোধিতা নয়।

এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভারসাম্য।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা কী?

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়। কর্মসংস্থান চায়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। নিরাপত্তা চায়। তারা চায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

তারা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়—কিন্তু বড় ভাই–ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক চায় না।

তাদের প্রত্যাশা অত্যন্ত পরিষ্কার:

বন্ধুত্ব চাই—আধিপত্য নয়।

সহযোগিতা চাই—খবরদারি নয়।

নদীর ন্যায্য হিস্যা চাই—করুণা নয়।

সীমান্তে শান্তি চাই—প্রাণহানি নয়।

ট্রানজিটে পারস্পরিক সুবিধা চাই—একতরফা লাভ নয়।

বাণিজ্যে ভারসাম্য চাই—নির্ভরতা নয়।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাই—বিদেশি হস্তক্ষেপ নয়।

সমমর্যাদার সম্পর্ক চাই—অভিভাবকত্ব নয়।

নতুন বাস্তবতায় নতুন সম্পর্ক

ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ককে এখন নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে।

ভারতকে শত্রু বানানো বাংলাদেশের স্বার্থে নয়। একইভাবে ভারতকে বাংলাদেশের অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়াও কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী, বাস্তববাদী এবং সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থভিত্তিক।

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে। বাণিজ্য থাকবে। যোগাযোগ থাকবে। সহযোগিতা থাকবে। নিরাপত্তা সহযোগিতাও থাকবে।

কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

বাংলাদেশ কারও শত্রু হতে চায় না। কিন্তু বাংলাদেশ কারও ছোট ভাইও হয়ে থাকতে চায় না। প্রতিবেশী হওয়া এক বিষয়। বন্ধু হওয়া আরেক বিষয়। কিন্তু অভিভাবক হয়ে বসা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের জনগণের বার্তা তাই স্পষ্ট— বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চায়—দাদাগিরি নয়। বাংলাদেশ সহযোগিতা চায়—আধিপত্য নয়। বাংলাদেশ সম্পর্ক চায়—কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে।

এটাই হওয়া উচিত নতুন ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ভিত্তি।