ভিউয়ের দৌড়ে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা উপেক্ষিত

Shahrier Islam Pallab
সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৩০ পূর্বাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২:৫৮ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ভিউ বাড়ানোর নেশায় যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়ানো হচ্ছে নানা তথ্য ও ভিডিও। কখনো ধর্ষণের শিকার নারীর পরিচয় প্রকাশ, কখনো চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা, আবার কখনো মৃত্যুর ঘটনাকে নিশ্চিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রচার করা হচ্ছে। এতে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা ছড়ানোর পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন ভুক্তভোগী পরিবার, পুলিশ ও মূলধারার সাংবাদিকেরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা ঘিরে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি ২৩ বছর বয়সী এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা ওই নারীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও প্রচার করেন। তার আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সাক্ষাৎকারও পরিচয়সহ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে পরিবারটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই সহোদরের মৃত্যু, আহত মা

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে ধল্লা ইউনিয়নে পূর্ববিরোধের জেরে দেশীয় অস্ত্রের হামলায় শহিদুল ইসলাম (২২) গুরুতর আহত হন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে মৃত ঘোষণা করে কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তার স্বজনদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পাল্টা মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।

সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির (১৪) মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়ায়। গত ১৫ জুন বিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। ছয় দিন পর ২১ জুন চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার মা হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ নয়জন গ্রেপ্তার হন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উপলক্ষে গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত

অভিযোগ রয়েছে, মারিয়ার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রচারের পাশাপাশি মরদেহে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও গোপনাঙ্গে রড ঢোকানোর মতো গুরুতর দাবিও ছড়ানো হয়। এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। অন্যদিকে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম। তবে মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ করে আসছে। মামলার আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন বলেন, মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা জরুরি। তার অভিযোগ, কিছু কনটেন্ট নির্মাতা রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছেন। তাদের যাচাইহীন প্রচারণায় জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ওসি মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, এরা অপসাংবাদিকতা করে থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য এমন জঘন্য কাজ করেছে। এরা মোটেও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা জানেন না। মারিয়া মাহির মৃত্যুকে ঘিরে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য নিয়ে পুলিশ বিব্রত হয়েছে বলে জানান তিনি। সিংগাইরের তিনটি ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।