ধুনটের ওসিকে এসপির ক্রেস্ট, পুরস্কার ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন

Shahrier Islam Pallab
বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৩:২৭ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩১ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বগুড়া ধুনট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুল ইসলামকে ক্রেস্ট দিলেন পুলিশ সুপার (এসপি) মির্জা সায়েম মাহমুদ। অথচ চাকরি করছেন (শেরপুর-ধুনট)-৫ আসনের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এর দিক নির্দেশনায়। একজন সুশৃংখল পুলিশ বাহিনীর ওসি হয়ে দলীয় এমপি'র অধীনস্থ হয়ে বা দিক নির্দেশনায় দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে চাকরি করা ইতিহাসে বিরল। যা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে বিতর্ক, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও নানা প্রশ্ন।

সম্প্রতি দেখা যায় সরকারি অনুমোদন বিহীন তথাকথিত ফেসবুক পোর্টাল আইডি থেকে "এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের দিক নির্দেশনায়" অপরাধ দমনে তৎপর ধুনট থানা (ওসি) আতিকুল ইসলাম। যা পরবর্তীতে "ওসি ধুনট থানা" কর্তৃপক্ষের ফেসবুক আইডি থেকে তা শেয়ার করে একমত পোষণ করে প্রচার করেন। এমন কর্মকাণ্ড দল মত নির্বিশেষে একটি সুশৃংখল বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ভূমিকা কোন নির্দিষ্ট দল, গুষ্টি বা ব্যক্তির নাকি এদেশ, জাতি, রাষ্ট্র সবার এমন বিতর্ক, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও নানা প্রশ্ন জেগে উঠেছে সমাজের সচেতন মহলের মাঝে। এরকম কর্মকাণ্ড বা প্রচার সুশৃংখল পুলিশ বাহিনীর নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলা বহির্ভূত, নাকি শৃঙ্খলা যুক্ত পরিপূর্ণ কাজ তা এখন সমাজের সচেতন মহলের মুখে মুখে। বর্তমানে তা ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে জনসম্মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে। এছাড়াও গত কয়েকদিন যাবত আরো কিছু তথাকথিত সরকারি অনুমোদন বিহীন ফেসবুক পোর্টাল আইডি থেকে ধুনট থানার ওসি'র কৃতিত্ব ও সাফল্য নিয়ে প্রচার করছে। পরবর্তীতে উক্ত পোস্ট গুলো "ওসি ধুনট থানা" কর্তৃপক্ষের ফেসবুক আইডি থেকে তা শেয়ার পোস্ট করে, একমত পোষণ করে প্রচার করতে দেখা যায়। উক্ত ওসি ক্ষুদ্রতম নিজের কৃতিত্ব ও সাফল্য নিজেই প্রচার করে তার সমস্ত অন্যায় অপরাধ ঢাকার বা গোপন করার চেষ্টা করছেন

আরও পড়ুন: আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ছাত্রী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

এদিকে উক্ত ঘটনা গুলোকে কেন্দ্র করে

ওসি'র বিরুদ্ধে সমাজের সচেতন মহল ও সাংবাদিক মহলের মাঝে আলোচনার ঝড় উঠেছে। উক্ত ধুনট থানার ওসি অপরাধ দমনে পুরস্কার, নাকি অপরাধের হিসাব কম দেখানোর কৃতিত্ব মনে হচ্ছে, পুলিশের সাফল্য মাপার জন্য অপরাধ কমানো নয়, অপরাধের হিসাব কম দেখানোই কার্য্যকর কৌশল। তিনি অপরাধ দমনে সফলতার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন, এমন ছবি ও লেখা এখন ফেসবুকে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে কোন সাফল্যের মান দণ্ডের এই পুরস্কার, নাকি অপরাধ দমনে, নাকি অপরাধের সংখ্যা কাগজে-কলমে কমিয়ে দেখানো দক্ষতার অপকৌশল।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহে হরিলুট: তথ্য গোপন, কৃষকদের হয়রানি ও সাংবাদিকের ওপর ডিসি ফুড কার্যালয়ে নগ্ন হামলা

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ধুনট থানায় গত এক মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২৫টি অথচ মামলা হয়েছে মাত্র ৫টি। অর্থাৎ ২৫টি চুরির ঘটনায় মামলার খাতায় জায়গা পেয়েছে মাত্র ৫টি। বাকি ২০টি ঘটনার কি হলো তা ঘটনার অন্তরালে। তাই অপরাধ কমেছে, নাকি অপরাধের মামলা কমেছে, এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝার মতো যোগ্যতা কি পুরস্কার নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের নেই। নাকি উক্ত ওসি'র অপরাধ কমানোর মাপকাঠি স্বরুপ পুরস্কৃত ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও ধুনটে সম্প্রতি প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা উদঘাটন এবং আসামি গ্রেফতারে সাফল্যের কারণে উক্ত ওসি পুরস্কৃত হয়েছেন। ওই চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। চোর চক্রের গ্রেফতার হওয়া সদস্যদের দেখতে থানায় এসে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। তাদেরও আটক করে চোর চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসাবে চালিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ড থেকে সন্দেহ জনক ভাবে আটক করা হয়। উক্ত ঘটনায় পুলিশ সুপার (এসপি) ধুনট থানার ওসিকে শোকজ করেন।

সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পরেও যদি পুরস্কারের কৃতিত্ব দাবি করা হয় বা দেয়া হয়। তাহলে পুরস্কার দেয়ার আগে অভিযোগ গুলোর সত্যতা যাচাই করা হলো না কেন। আর সেই সাফল্যের কৃতিত্ব নিয়ে ওসি পুরস্কারই কিভাবে পেলেন। অথচ সেই সাফল্যের আড়ালেই যদি অভিযোগ, বিতর্কিত আটক কিংবা আর্থিক লেনদেন গুলো থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত ঘটনা গুলো কি ঘটনার অন্তরালেই রয়ে যাবে। তাই পেশাগত সাফল্য গুলো উদঘাটন করা এবং পুরস্কারের মানদণ্ড নির্ণয় করে তারপরও অপরাধ দমনে সাফল্যের পুরস্কার দেয়া প্রকৃত প্রাপ্যদের জন্য। আর সেই সাথে বিতর্কিতদেরকে নিয়ম-নীতি ও শৃংখলা বহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবেই পুলিশের দায়িত্বশীলতা ও মনোবল ফিরিয়ে আসবে এবং সমাজের সচেতন মহলের জনমনে পুলিশের প্রতি আস্তা, বিশ্বাস ও ভরসা ফিরিয়ে পাবে।

এদিকে ধুনট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে, যে আপনি একজন পুলিশ অফিসার হয়ে দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) এর সাথে যৌথ ছবি দিয়ে তার দিক নির্দেশনায় দায়িত্ব কর্তব্য পালন করছেন। উক্ত বিষয়টি সে অস্বীকৃতি জানিয়ে পাশ কাটিয়ে যায় এবং বলেন যে ঘটনাটি অন্য কেউ করেছেন। তার কাছে শোকজ এর বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন যে ঘটনাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। 

এবিষয়ে বগুড়া জেলা পুলিশ (অপরাধ শাখা) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ্যাডিঃ এসপি) রায়হান বলেন যে, একজন পুলিশ অফিসার হয়ে দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) এর সাথে যৌথ ছবি দিয়ে তার দিক নির্দেশনায় দায়িত্ব কর্তব্য পালন করছেন। ধুনট থানার ওসি এমন ধরনের পোস্ট ফেসবুকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করা অসভনীয় এবং সে যেটা করেছেন নিজ উদ্যোগে ব্যক্তিগত ভাবে। বিষয়টি আমরা জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষ অবগত নই। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসলে ডিপার্টমেন্টালি ভাবে বিধি-ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়াও উক্ত ওসিকে পূর্বে যে শোকজ করা হয়েছিল তা মৌখিক ভাবে জবাব দিয়েছে এবং অফিসিয়ালি ভাবে কার্যক্রম চালমান আছে বলে জানান তিনি।