আগামী বছরের নভেম্বরে তিস্তা মহাপরিকল্পনার উদ্বোধনের সম্ভাবনা: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
তিস্তা নদীর ভাঙন, বন্যা, খরা ও নদীভাঙনজনিত দুর্ভোগ কমিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ আগামী বছরের নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর নিষ্কাশন খাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: কিশোরগঞ্জে স্তন ক্যান্সার সেবার বিস্তারে ৫ দফা দাবি
প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার জন্য নদী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কারিগরি কমিটি কাজ করছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরে এলে প্রকল্পের অনুমোদনের বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ। তাই প্রকল্পটি যেন টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সিইজিআইএস, নদী কমিশনের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি চীন, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটগ্রহণ শেষ, চলছে গণনা
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত ও কারিগরি পরামর্শ সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হবে। কোন পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করলে এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি সুফল পাবেন, তা নিশ্চিত করেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। এ কারণে ডিপিপি তৈরিতে আরও আট থেকে নয় মাস সময় লাগতে পারে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বদলে যেতে পারে উত্তরাঞ্চলের চিত্র
তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, বন্যা ও ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নদীর নাব্যতা, পানিপ্রবাহের তারতম্য এবং চরাঞ্চলের মানুষের অনিশ্চিত জীবনযাপনও দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
এ পরিস্থিতিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীতীর সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর—এই পাঁচ জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ এ প্রকল্পের সুফল পেতে পারেন। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, ব্যয়, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণের পর এর সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
১৯ নভেম্বর উদ্বোধন হবে মহেন্দ্রনগর নিষ্কাশন খাল
মহেন্দ্রনগর নিষ্কাশন খাল খনন কার্যক্রম প্রসঙ্গে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী খালটির উদ্বোধন করবেন। খালটি খনন ও উন্নয়নের ফলে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এতে কৃষিজমিতে পানির প্রাপ্যতা বাড়বে এবং কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তিনি আরও জানান, খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণ করা হবে। এর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও সবুজায়নে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। খালটির উন্নয়ন স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, খালটি কার্যকরভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এ সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত খাল পরিষ্কার, পানিপ্রবাহ সচল রাখা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাস্তবায়নের অপেক্ষায় তিস্তাপাড়ের মানুষ
তিস্তা মহাপরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রত্যাশিত উন্নয়ন উদ্যোগ। নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষিজমি রক্ষা, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং নদী ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের আশায় রয়েছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ।
তবে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণার পাশাপাশি দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পনাটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায় এবং এর সুফল প্রান্তিক কৃষক, জেলে, চরাঞ্চলের বাসিন্দা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে যায়।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা সুনীল কুমার, লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোনীতা দাসসহ স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিএনপির নেতৃবৃন্দ।





