ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে মানবতার দস্তরখানা, সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে খাবার পান ২০০ মানুষ

Shahrier Islam Pallab
শ্রী দিপু চন্দ্র গোপ, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৩:৫১ অপরাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫১ অপরাহ্ন, ২২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শাহবাজ ফাউন্ডেশন। উপজেলার ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে সংস্থাটির উদ্যোগে পরিচালিত ‘মানবতার দস্তরখানা’য় সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছেন প্রায় ২০০ অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষ। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে চলা এ উদ্যোগে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর পাশাপাশি সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতার বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে।

শনিবার, সোমবার ও বুধবার ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে খাবার বিতরণের সময় দেখা যায়, সেখানে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রিকশাচালক, বাসের হেলপার, দিনমজুর, ভিক্ষুক ও অসহায় পথচারী। একসঙ্গে বসে খাবার খাচ্ছেন সবাই। নেই ধনী-গরিবের ভেদাভেদ কিংবা শ্রেণিগত বিভাজন। একবেলা পেট ভরে খেতে পেরে তৃপ্তির হাসি ফুটছে অনেকের মুখে।উদ্যোক্তারা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেক শ্রমজীবী মানুষকে প্রতিদিনের খাবারের খরচ নিয়েও হিমশিম খেতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে খাবার পাওয়ায় তাঁদের কিছুটা স্বস্তি মিলছে।খাবার খেতে আসা রিকশাচালক নূর আলম বলেন,সারা দিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। অনেক সময় নিজের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে পরিবারের জন্য নিয়ে যেতে হয়। এখানে সপ্তাহে তিন দিন পেট ভরে খেতে পারি। এতে আমাদের মতো গরিব মানুষের অনেক উপকার হয়। যাঁরা এই ব্যবস্থা করেছেন, আল্লাহ তাঁদের ভালো রাখুন।বাসের হেলপার আব্দুল করিম বলেন,সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাসে কাজ করি। অল্প বেতনে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। বাইরে একবেলা খাবার খেতেও অনেক টাকা লাগে। এখানে বিনামূল্যে খাবার পাওয়ায় আমাদের সুবিধা হচ্ছে। এমন ব্যবস্থা প্রতিদিন থাকলে শ্রমজীবী মানুষের আরও উপকার হতো।ভিক্ষুক নাজমা বেগম বলেন,মানুষের কাছে হাত পেতে যা পাই, তা দিয়ে কোনো দিন খেতে পারি, আবার কোনো দিন না খেয়েও থাকতে হয়। এখানে এসে পেট ভরে খেতে পারি। কেউ আমাদের অবহেলা করে না। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাই। যাঁরা খাবার দেন, তাঁদের জন্য মন থেকে দোয়া করি।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় সাবেক এমপি এএনএম ইউছুফের মৃত্যুবার্ষিকী পালন

এক দিনের উদ্যোগ থেকে সপ্তাহে তিন দিন

শাহবাজ ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে ভুলতায় সপ্তাহে মাত্র এক দিন খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে মানুষের সাড়া ও চাহিদা বাড়তে থাকায় সপ্তাহে দুই দিন খাবার দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে প্রতি শনিবার, সোমবার ও বুধবার নিয়মিত এ আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন সংগঠনের সদস্যরা।

আরও পড়ুন: বোরকা পরে হামলা করতে গিয়ে নিজেই খুন

এ কার্যক্রমের অন্যতম শক্তি স্থানীয় তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা। কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁরা খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন ও বিতরণের কাজে সহযোগিতা করেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁদের প্রধান প্রেরণা।শাহবাজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক মোহাম্মদ ইয়ামিন মিয়া বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের মূল শাখা ঢাকায়। সেখানে শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হয়। রূপগঞ্জের ভুলতায় প্রথমে সপ্তাহে এক দিন এ কার্যক্রম শুরু করি। পরে দুই দিন এবং বর্তমানে তিন দিন খাবার বিতরণ করছি। মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি।তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে আরও বেশি মানুষের কাছে বিনামূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়া যায়।স্থানীয়দের মতে, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে এলে অসহায় মানুষের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চাও বাড়বে।ভুলতা ফ্লাইওভারের নিচে শাহবাজ ফাউন্ডেশনের ‘মানবতার দস্তরখানা’ এখন শুধু খাবার বিতরণের আয়োজন নয়, বরং অসহায় মানুষের জন্য নির্ভরতা ও সহমর্মিতার একটি জায়গা। স্বেচ্ছাসেবীদের নিরলস প্রচেষ্টায় পরিচালিত এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে উপকৃত হবেন সমাজের বহু সুবিধাবঞ্চিত মানুষ।