আস্থা হারালে হারাবে অর্থনীতি: ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা

Sanchoy Biswas
এম এফ ইসলাম মিলন
প্রকাশিত: ৫:৩৮ অপরাহ্ন, ০৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৭:২০ অপরাহ্ন, ০৫ জুন ২০২৬
এম এফ ইসলাম মিলন, উদ্যোক্তা ও কলামিস্ট। ছবিঃ সংগৃহীত
এম এফ ইসলাম মিলন, উদ্যোক্তা ও কলামিস্ট। ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ব্যাংকিং খাত। একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, আমদানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে দেশের কোনো বৃহৎ ব্যাংককে ঘিরে নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনোই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সাময়িক সুবিধা-অসুবিধার আলোকে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন: সুন্দরবন সুরক্ষা: ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্লু কার্বন অর্থায়ন

অনেক সময় রাজনৈতিক আবেগ বা দলীয় অবস্থান থেকে কেউ কেউ মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের দুর্বলতা বা সংকট কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির ক্ষতির কারণ হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একটি বৃহৎ ব্যাংকের তারল্য সংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা কিংবা পরিচালনা সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ডমিনো ইফেক্ট সৃষ্টি করতে পারে। মানুষ যখন একটি ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়, তখন সেই উদ্বেগ ধীরে ধীরে অন্যান্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে আমানত প্রত্যাহার, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণ, ডলার সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং আস্থার সংকটসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো বড় ব্যাংককে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু ব্যাংকের মালিকপক্ষ বা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ওপর পড়বে না; এর প্রভাব পড়বে সাধারণ আমানতকারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রবাসী পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর।

আরও পড়ুন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাল ধরলেন বাস্তবতার মানুষ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। যদি কোনো কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায় এবং মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হয়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রা বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে লাভবান হয় হুন্ডি চক্র ও অর্থ পাচারকারীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র।

তাই ইসলামী ব্যাংক কিংবা অন্য যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি, অর্থপাচার বা অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে সেই অভিযোগ অবশ্যই আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো সিদ্ধান্ত যেন ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না করে।

একটি আধুনিক রাষ্ট্রে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ-

প্রথমত, পেশাদার ও যোগ্য পরিচালনা পর্ষদ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামো।

তৃতীয়ত, আমানতকারীদের আস্থা রক্ষার নিশ্চয়তা।

সরকারের দায়িত্ব হলো ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা। যেকোনো পরিবর্তন বা পুনর্গঠন হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পেশাদার মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, দায়িত্বশীলতা। প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কারণ একটি ব্যাংক ধ্বংস হলে কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে তাই ইসলামী ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে।

লেখক:

এম এফ ইসলাম মিলন, উদ্যোক্তা ও কলামিস্ট।