হুমায়ূন আহমেদের শেষ অভিমান: ফিনিক ফোটা জোছনা ও সৃষ্টির হাহাকার

Sadek Ali
বাহাউদ্দিন গোলাপ
প্রকাশিত: ২:৪২ অপরাহ্ন, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৮ অপরাহ্ন, ১৯ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

​১৯ জুলাই এলে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে এক ধরণের গভীর ও মনকেমন করা একাকীত্ব নেমে আসে। এক যুগেরও বেশি সময় আগে এই শ্রাবণে বাংলা সাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর এই চলে যাওয়া এদেশের মানুষের প্রকৃতি দেখার, বৃষ্টি ছোঁয়ার আর জোছনা উপভোগ করার চোখটিকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। তিনি স্রেফ কিছু জনপ্রিয় বই লেখেননি বা শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে গল্প বুনে যাননি, বরং বাঙালির অনুভূতির ভেতর এমন এক চিরস্থায়ী মায়া বুনে দিয়ে গেছেন, যার কারণে চারপাশের চেনা রূপকে নতুন করে না ভালোবেসে আমাদের আর উপায় থাকে না। শহরের ইঁদুরদৌড়ে ব্যস্ত নাগরিক মানুষ যখন স্রেফ বেঁচে থাকার ক্লান্তিকর লড়াইয়ে হাঁপিয়ে উঠছিল, ঠিক তখন তিনি এক মুঠো চাঁদের আলো আর টিনের চালে বৃষ্টির সুর শুনিয়ে আমাদের শিখিয়েছিলেন একটু থামতে, জানালার ওপাশে আকাশের দিকে চোখ মেলতে। প্রকৃতির প্রতি এই যে গভীর টান, এটি তাঁর শেষ জীবনে এসে এক বেদনাবিধুর রূপ নিয়েছিল।

​জীবনের সেই শেষ অঙ্কে এসে, যখন বিদেশের এক যান্ত্রিক হাসপাতালে ক্যানসারের সাথে তাঁর কঠিন লড়াই চলছিল, তখন নিজের চেনা জগৎ থেকে তিনি ছিলেন হাজার মাইল দূরে। ২০১২ সালের বইমেলায় যখন তাঁর স্মৃতিকথামূলক বই ‘কাঠপেন্সিল’ প্রকাশিত হয়, পাঠক তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি এটাই হতে যাচ্ছে তাঁদের প্রিয় লেখকের শেষ উপহার। এটি কেবল কোনো সাধারণ স্মৃতিকথা ছিল না, বরং ক্যানসারের নিদারুণ কেমোথেরাপির যন্ত্রণা ও ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবনকে ফিরে দেখার এক জীবন্ত দলিল ছিল। ​নিউইয়র্কের হাসপাতালের নির্জন কেবিনে শুয়ে, যেখানে দিন-রাতের তফাত বোঝা যেত না আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঠান্ডা পদধ্বনি শোনা যেত, সেখান থেকেই তাঁর মনে ব্যাকুল হয়ে জাগছিল নুহাশ পল্লীর সবুজ প্রান্তর, কদম ফুলের ঘ্রাণ আর বাংলার চেনা বর্ষার স্মৃতি। জীবনের সমস্ত মায়া আর লেখার তাগিদ বুকে চেপে তিনি সেই বইয়ের পাতায় লিখেছিলেন এক গভীর আর্তি, যা আজীবন প্রতিটি পাঠককে স্তব্ধ করে দেবে। হাসপাতালের মনিটরের কৃত্রিম শব্দের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁর কলম থেকে ঝরে পড়েছিল এক খাঁটি মানুষের বুকের গভীর হাহাকার: 

আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদের শেষ অভিমান: ফিনিক ফোটা জোছনা ও সৃষ্টির হাহাকার

“পৃথিবীতে ফিনিক ফোটা জোছনা আসবে। শ্রাবণ মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার বাজবে। সেই অলৌকিক সঙ্গীত শোনার জন্য আমি থাকব না। কোনো মানে হয়..”

​লেখকের বুকের এই হাহাকার ও কয়েকটি লাইনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভাবনার দিকে তাকালে এক অসীম শূন্যতা গ্রাস করে। হুমায়ূন আহমেদ যখন ‘ফিনিক ফোটা জোছনা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন, তখন তা কেবল আকাশের এক প্রাকৃতিক আলোর জড় বর্ণনা থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মাকে নাড়া দেওয়া এক অদ্ভুত মায়াজাল। তিনি জোছনাকে ঘরের চার দেয়াল থেকে টেনে এনে মানুষের মনের খুব কাছের আঙিনায় দাঁড় করিয়েছিলেন, যার মোহে তাঁর উপন্যাসের চরিত্ররা ঘর ছেড়ে উদাসী হয়ে হেঁটে যেত অন্তহীন রাত্রির দিকে। নাগরিক মধ্যবিত্ত যখন সমাজে ও পরিবারে চরম একা হয়ে যায়, তখন সে ছাদে যায় বা বৃষ্টিতে ভেজে। প্রকৃতি এখানে মানুষের একাকীত্বের এক নীরব সহচর—যা মানুষকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আর এখানেই লুকিয়ে আছে তাঁর শেষ বাক্যের সেই অন্তহীন জিজ্ঞাসা।

আরও পড়ুন: জুলাই ২৪ কি একটি বিপ্লবের শুরু, নাকি একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি?

​এই পুরো লেখার সবচেয়ে গভীর এবং ভাবুক মনস্তত্ত্বটি লুকিয়ে আছে একদম শেষের ওই ছোট্ট বাক্যটিতে— “কোনো মানে হয়..।” আপাতদৃষ্টিতে একে খুব সাধারণ একটি আক্ষেপ মনে হলেও, এর গভীরে জড়িয়ে আছে জীবনের এক পরম ও নিষ্ঠুর সত্য। ​এখানে কোনো কঠিন তত্ত্বের বেড়াজাল নেই, অথচ এর চেয়ে বড় জীবনদর্শন আর কী-ই বা হতে পারে! পৃথিবীটা এত অবিশ্বাস্যকর রকম সুন্দর, তার জোছনার আলো এত তীব্র, বর্ষার সুর এত মধুর—অথচ এই সবকিছুর শ্রেষ্ঠ সমঝদার যে মানুষটি, তার আয়ু কতটুকুই বা! প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চিরকাল সেজেগুজে থাকবে, কোনো এক শ্রাবণে আবারও টিনের চালে মেঘমল্লার রাগে বৃষ্টি নামবে, অথচ যে মানুষটি এই প্রকৃতিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসলো, সে-ই একদিন মহাকালের নিয়মে বেমালুম হাওয়া হয়ে যাবে। এই নির্মম সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি এক অদ্ভুত মায়াবী অভিমান ফুটে ওঠে। এই “কোনো মানে হয়” আসলে মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের এক নীরব কিন্তু তীব্র ক্ষোভ। অন্ধকার ওপারে চলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এই সুন্দর পৃথিবীর আলো আর হাওয়ার প্রতি এক নশ্বর মানুষের শেষ আকুতি।

​তবে প্রকৃতি ও মানুষের এই খেলায় শেষ পর্যন্ত এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছিল লেখকের বিদায়বেলায়। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই লিখেছিলেন, “চান্নি-পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।” জোছনার আলোয় স্নান করতে করতে এই চেনা পৃথিবীর মায়া কাটানোর এক অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল তাঁর মনের গভীরে। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর শেষ বিদায়ের মূহূর্তে বিশ্বপ্রকৃতি যেন আকাশ ভেঙে আলো দিয়ে তাঁকে বরণ করে নেয়। কিন্তু নিয়তির চিত্রনাট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, হয়তো কিছুটা নিষ্ঠুরও। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যখন নিউইয়র্কের হাসপাতালের কেবিনে তাঁর চোখের পাতা চিরতরে বুজে এলো, প্রকৃতির নিয়মে সেদিন আকাশে চাঁদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না; সেদিন ছিল ঘোর অমাবস্যা। প্রকৃতি তাঁকে সেই রূপোলি জোছনা দিয়ে বিদায় জানায়নি ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রিয় এই বাংলাদেশের আকাশ সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল। চারদিক ভাসিয়ে নেমেছিল শ্রাবণের অবিরাম ধারা। যে অলৌকিক সঙ্গীতের কথা তিনি নিজে ‘কাঠপেন্সিল’ বইয়ে লিখে গিয়েছিলেন, প্রকৃতি যেন সেদিন তাঁরই শবযাত্রায় সেই বৃষ্টির সেতার বাজিয়েছিল। জোছনা না পাওয়ার আক্ষেপটা প্রকৃতি ধুয়ে দিয়েছিল আকাশের সমস্ত জল ঢেলে, যা ছিল এক পরম বিষাদের আলোড়ন।

​আজ নুহাশ পল্লীর সেই শান্ত লিচু তলার নির্জনতায় তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকলেও তাঁর সৃষ্ট সেই মায়াবী জগৎ কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। যে মানুষটি প্রকৃতির সুরকে পরম মমতায় শব্দে বেঁধে দিতেন, তিনি আজ নিজেই সেই অনন্ত সুরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ এতগুলো বছর পেরিয়েও যখন মধ্যরাতে কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফিনিক ফোটা আলোর প্লাবন দেখে আনমনা হয়, কোনো তরুণ যখন একলা রাতে খালি পায়ে হেঁটে জোছনা মাপার চেষ্টা করে, কিংবা আকাশ মেঘলা হলে কোনো তরুণী নীল শাড়ি পরে প্রথম বর্ষণের স্পর্শ নিতে হাত বাড়ায়, তখন অলক্ষ্যেই হুমায়ূনের তৈরি করা সেই জগৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। অলস দুপুরে জানালার গ্রিল ধরে মেঘ ভাঙা শব্দের আবহ শোনা, নীলপদ্মের খোঁজে প্রিয় মানুষের জন্য আকুল প্রতীক্ষা কিংবা হলুদ পাঞ্জাবি গলিয়ে হিমুর মতো অচেনা পথে নেমে পড়া—সবই যেন এক আশ্চর্য মায়ার বাঁধন। নতুন প্রজন্মের মননে প্রকৃতি ও আবেগকে এভাবে অনুভব করার যে চোখ তিনি তৈরি করে দিয়েছেন, সেটাই তাঁর শ্রেষ্ঠ চিরস্থায়ী উপহার।যান্ত্রিক জীবন হয়তো নিতান্তই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু নশ্বরতার সীমানা পেরিয়ে প্রকৃতির বুকে তিনি যে নিখাদ ভালোবাসার আখ্যান বুনে গেছেন, তা কোনোদিন ম্লান হবার নয়। মৃত্যুর হিমশীতল হাত তাঁর শরীরকে কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এদেশের কোটি পাঠকের হৃদয়ে যে মায়াজগৎ তিনি অমর করে গেছেন, তাকে স্পর্শ করার সাধ্য কার! তিনি বেঁচে থাকবেন যতদিন এই বাংলায় বৃষ্টি নামবে, যতদিন আকাশে চাঁদ উঠবে, জোছনা ঝরবে।

বাহাউদ্দিন গোলাপ, (লেখক: সংগঠক, গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)