নারীর ক্ষমতায়ন: কাচের ছাদ ভেঙে সম্ভাবনার দিগন্তে
"যে পাখি আকাশে উড়তে চায়, তার ডানার শক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উন্মুক্ত আকাশের।" মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারীর ক্ষমতায়নও ঠিক তেমনই—যোগ্যতা ও সুযোগের এক সুষম সমন্বয়। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে নারী আজ রাষ্ট্র পরিচালনা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, কূটনীতি, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে অসামান্য অবদান রাখছেন। তবুও বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা এখনও অদৃশ্য বাধা, বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি।
বিশ্বব্যাপী নারীর অগ্রযাত্রা ব্যাখ্যা করতে সমাজবিজ্ঞানীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো Glass Ceiling বা "কাচের ছাদ"। এটি এমন এক অদৃশ্য বাধা, যা নারীদের উচ্চপদে উন্নীত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বহু নারী শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে পৌঁছাতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান কিংবা ইউরোপের বহু উন্নত দেশেও এই বাস্তবতা পুরোপুরি দূর হয়নি।
আরও পড়ুন: প্রাচীন পুরাণ থেকে আধুনিক মানুষের অন্তর্জগৎ: নোবেলজয়ী কবি অ্যান কারসনের সাহিত্যদর্শন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Sticky Floor বা "আঠালো মেঝে"। এটি এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বহু নারী নিম্ন আয়ের বা নিম্নপদস্থ কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘদিন আটকে থাকেন এবং উপরে ওঠার সুযোগ পান না। বিশেষত দরিদ্র, গ্রামীণ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা এই সমস্যার শিকার হন। অনেক সময় পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক রীতি বা দক্ষতা উন্নয়নের সীমিত সুযোগ তাঁদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকরা আরও কিছু নতুন শব্দ ব্যবহার করছেন। যেমন Broken Rung—অর্থাৎ কর্মজীবনের প্রথম দিকের পদোন্নতির ধাপে নারীরা পিছিয়ে পড়া; Maternal Wall—মাতৃত্বের কারণে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়া; এবং Glass Cliff—সংকটময় সময়ে নারীদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হলেও সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়া।
আরও পড়ুন: নীল অর্থনীতির দুয়ার: অর্থনীতির নতুন জোয়ার
তবে আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে নারীর ক্ষমতায়নের এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন, আন্তর্জাতিক আর্থিক ও প্রযুক্তি খাতের অসংখ্য নারী নেতৃত্ব প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্বের দক্ষতা লিঙ্গনির্ভর নয়, বরং যোগ্যতা ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-5) লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ উন্নয়ন অর্থনীতির একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য হলো—নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যত বাড়ে, সমাজের সামগ্রিক কল্যাণও তত বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নের যাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আজ দেশের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক অনন্য অধ্যায়। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, নারীদের স্বনিযুক্তি, স্থানীয় সরকারে অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার তাঁদের ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। কর্মক্ষেত্রে সমমজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নেতৃত্বের উচ্চস্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব, প্রযুক্তি খাতে অংশগ্রহণ, সম্পত্তির অধিকার এবং সামাজিক কুসংস্কার এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহুরে নারীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য দূর করা জরুরি।
নারীর ক্ষমতায়নকে আমি "সম্ভাবনার সেতুবন্ধন" বলতে চাই—যেখানে প্রতিভা, শিক্ষা, মর্যাদা ও সুযোগ একসূত্রে গাঁথা থাকে। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন নারীরা কেবল উন্নয়নের অংশীদার নন, বরং উন্নয়নের নকশা প্রণয়ন ও নেতৃত্বেরও অংশ হন।
প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী এলিনর রুজভেল্ট বলেছিলেন, “The future belongs to those who believe in the beauty of their dreams.” তাই স্বপ্নের সৌন্দর্যে বিশ্বাসী নারীদের জন্য প্রয়োজন সমান সুযোগ, সমান মর্যাদা এবং সমান আস্থা।
অতএব, নারীর ক্ষমতায়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা ও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। কাচের ছাদ ভেঙে, আঠালো মেঝের বন্ধন ছিন্ন করে এবং বৈষম্যের অদৃশ্য দেয়াল অতিক্রম করে নারীরা যখন এগিয়ে যাবেন, তখনই নির্মিত হবে অধিকতর মানবিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ—এবং আরও আলোকিত বিশ্ব।
লেখক: কাজী জিয়া উদ্দিন, কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি





