দ্রব্যমূল্যের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ
রাজধানীসহ দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ছয় মাসের ব্যবধানে টমেটো, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি কাঁচা মরিচ, চিনি ও সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। ফলে বাজার করতে গিয়ে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর-৬, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, মানভেদে প্রতি কেজি টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে সাইজভেদে এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে। এক মাসের বেশি সময় ধরে বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে ডিম। আগে এক ডজন ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে এর দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগির দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড সোনালি বা কালারবার্ড মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি।
মাছের বাজারেও বেড়েছে কয়েক ধরনের মাছের দাম। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে তেলাপিয়ার দাম ছিল ২০০ থেকে ২৩০ টাকা এবং পাঙাশের দাম ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। রুই-কাতলার দাম বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। বড় আকারের রুই বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি। সবজির বাজারে টমেটোর পাশাপাশি কয়েকটি পণ্যের দামও বেড়েছে। লম্বা বেগুন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে বর্তমানে ১৬০ টাকা কেজিতে উঠেছে। গত সপ্তাহেও এর দাম ছিল ১২০ টাকা। মার্চের শেষ দিকে কাঁচা মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা। তবে সব ধরনের সবজির দাম বাড়েনি। করলা বর্তমানে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা মার্চে ছিল প্রায় ১০০ টাকা। পেঁপের দামও প্রায় একই রয়েছে, ৪০ টাকা কেজি। বেশির ভাগ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজির মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। মিরপুর কাজীপাড়া থেকে বাজার করতে এসেছেন মুক্তার আলী। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে টমেটো কিনেছেন। এখন সেই টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি। বাজারে অন্যান্য পণ্যের দামও বেশি হওয়ায় সংসারের খরচ সামলাতে তাকে কম পরিমাণে পণ্য কিনতে হচ্ছে। মিরপুর শেওড়াপাড়া থেকে বাজার করতে আসা বদরুল হাসান বলেন, টমেটোর দাম এতটা বেড়ে যাবে, তা ভাবেননি। আগে যে টাকায় কয়েক ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন একই টাকায় অল্প কিছু পণ্য কিনতে হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় টমেটোর পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন তিনি। মিরপুর-৬ বাজারের বিক্রেতা আলাল উদ্দিন বলেন, কয়েক মাস আগে বাজারে টমেটোর সরবরাহ বেশি ছিল। তখন দামও কম ছিল। এখন সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুম পরিবর্তনের কারণে কয়েক ধরনের সবজির সরবরাহ কমেছে। এ কারণে এসব পণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে। আর ডিম ও মুরগির ক্ষেত্রে খামারে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা।
আরও পড়ুন: কমল স্বর্ণের দাম
এদিকে ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে। এক মাস আগের তুলনায় খোলা চিনির দামও বেড়েছে। বর্তমানে খোলা চিনি ১১৫ টাকা এবং মোড়কজাত চিনি ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে রাজধানীর বাজারে বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের ফলের দাম বাড়লে ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কলার দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় অধিকাংশ ফলে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। তবে ব্যতিক্রম ফল কলার দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম
সরেজমিনে রাজধানীর নিউ মার্কেট বাজার ঘুরে দেখা যায়, আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর, ডালিমসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফলের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। ফলভেদে কেজিতে ৫, ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বিক্রেতারা জানান, ফলের দাম ওঠানামার পেছনে সরবরাহ পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয়, সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ খরচসহ বিভিন্ন বিষয় কাজ করছে। আমদানি করা ফলের ক্ষেত্রে আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় ও সরবরাহের পরিবর্তনের প্রভাবও খুচরা বাজারে পড়ছে। ফল বিক্রেতা রশীদ বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় কয়েক ধরনের ফলে কেজিতে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তবে কলার দাম প্রায় একই আছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে আমাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ক্রেতারাও। তাদের অভিযোগ, সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ফল কেনা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। একই পরিমাণ ফল কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ক্রেতা সোহানুর রহমান বলেন, আগে যে টাকা দিয়ে এক কেজি ফল কিনতাম, এখন একই ফল কিনতে বাড়তি টাকা লাগছে। কয়েকটি ফলে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়লেও বাজারে ফলের চাহিদা পুরোপুরি কমে যায়নি। তবে অনেক ক্রেতা পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ বেশি দামের ফল বাদ দিয়ে তুলনামূলক সস্তা ফল কিনছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে এবং বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও বিভিন্ন পর্যায়ের দামের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। ফলের দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতাদের প্রত্যাশা, বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়বে এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





