স্কুল-কলেজে মাদক ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা মাউশির

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ন, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪৯ অপরাহ্ন, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • র‌্যাগ ডের নামে বিশৃঙ্খলা বন্ধের নির্দেশ
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর সরকার
  • সব স্কুল-কলেজে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ
  • নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন গড়তে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন

দেশের সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের বিস্তার রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ এবং ‘র‌্যাগ ডে’র নামে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বিশেষ সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। 

শিক্ষাবিদদের মতে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারকে সন্তানের প্রতি যত্নশীল হতে হবে, শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের আচরণ ও মানসিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে এবং প্রশাসনকে আইন প্রয়োগে সক্রিয় থাকতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষাঙ্গনকে মাদক, ইভটিজিং ও অপরাধমুক্ত করে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। সর্বশেষ গতকাল রোববার মাউশির এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিটি অধিদফতরের সব অঞ্চলের পরিচালক, বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। কমিটিতে শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ঢাবি ক্যাম্পাসের পাঁচ স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, আটক ২

চিঠিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কমিটির গত ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মাসিক সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কমিটি গঠনের পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ধফ-ধফসরহ@ফংযব.মড়া.নফ ই-মেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা

এরআগে গত ১৩ অক্টোবর মাউশির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক অফিস আদেশে মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নির্মিত মাদকবিরোধী প্রামাণ্যচিত্র ও থিম সং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং প্রতিরোধ এবং ‘র‌্যাগ ডে’র নামে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী করতে নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ, সভা-সেমিনার ও সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে রাতে শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়, সে বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাউশি সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পরিচালক ও উপপরিচালকদের নিজ নিজ অঞ্চলের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংগ্রহ ও প্রতিবেদন আকারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এ জন্য ২৬ অক্টোবরের মধ্যে নির্ধারিত ছকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই শুধু নির্দেশনা নয়, নিয়মিত তদারকি, সচেতনতা সৃষ্টি এবং অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, মাউশির এ নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক, ইভটিজিং ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কার্যকর অগ্রগতি হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে মাদকের বিস্তার, ইভটিজিং ও কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নানা প্রলোভন, অসৎ বন্ধুমহল ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে এসব সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, সচেতনতা এবং নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রসঙ্গত, স্কুল-কলেজে যাতায়াতের পথে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, অশালীন মন্তব্য, অনুসরণ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি করার মতো ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ইভটিজিংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে চাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এ জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ও ইভটিজিং প্রতিরোধ কমিটি গঠন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত অভিভাবক সভা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে মাদক ও হয়রানিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন।

অভিভাবকদের প্রত্যাশা, কোনো শিক্ষার্থী যেন মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে না যায় এবং কোনো ছাত্রী যেন ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে শিক্ষাজীবন থেকে পিছিয়ে না পড়ে। শিক্ষাঙ্গনে অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিশ্চিত হোক, অপরাধী যে-ই হোক, আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।