রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট: মির্জা ফখরুল ও কর্নেল অলির মনোনয়ন বৈধ
রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ। আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো দুই রাজনৈতিক মেরুর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, অলি আহমদের পক্ষে দুটি এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে একটি মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে সবগুলো প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করায় প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: পরাজয়ের সমীকরণ জেনেও রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদের দুই মনোনয়ন
ইসি সূত্র জানায়, অলি আহমদের পক্ষে দাখিল করা দুটি মনোনয়নপত্রের মধ্যে প্রথমটি যাচাই-বাছাই করে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্রও যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন।
ভোটের লড়াইয়ে দুই রাজনৈতিক শিবির
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির দুই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ
মনোনয়ন বৈধ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এখন আর কেবল সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং তা পরিণত হয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা ফখরুল এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দলের প্রার্থী হয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
ফলে ২০ আগস্টের ভোটকে ঘিরে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিরোধী জোট কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট ধরে রাখতে পারে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের ভোট কতটা দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট
রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থী বৈধ হওয়ায় আবারও সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল নিয়ে আগাম নানা হিসাব থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন নিজেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একজন ব্যক্তিকে সাংবিধানিক পদে বসানোর প্রক্রিয়া নয়; সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নেতৃত্ব বাছাইয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
২০ আগস্ট সংসদ ভবনে ভোট
ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ ভবনে নির্ধারিত সময়ে সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ ভবনেই ব্যালট গণনা ও প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। বৈধ প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও স্পষ্ট হবে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ফলে জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, জাতীয় সংসদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
ভোটের অঙ্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতা ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করছে। অন্যদিকে অলি আহমদকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি ও ঐক্যের একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কে জয়ী হবেন—এই প্রশ্নের পাশাপাশি কত ভোট পড়ল, বিরোধী জোটের প্রার্থী কত ভোট পেলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ভোট পড়ল কি না এবং সংসদ সদস্যদের ভোটের আচরণ ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী ধরনের বার্তা দেয়—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সংসদীয় রাজনীতির কার্যকারিতা, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
শেষ মুহূর্তে নজর প্রার্থিতা প্রত্যাহারে
মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর এখন সবার নজর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমার দিকে। ১৮ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। কোনো প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে ২০ আগস্ট সংসদ ভবনে দুই প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে ফিরছে। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা সমীকরণ থাকলেও এবারের নির্বাচনের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নেতৃত্ব নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান হওয়ার মধ্যে।
২০ আগস্টের ভোট তাই শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়—সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অবস্থান, দলীয় আনুগত্য এবং সাংবিধানিক দায়িত্ববোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে।





