জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, এবার ডেঙ্গুতে বাবাকে হারাল আরফা

অক্টোবরে ভয়ংকর ডেঙ্গু, তিন দিনে কেড়ে নিল ২৭ প্রাণ

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:২৫ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৭ অপরাহ্ন, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সদ্য বিগত সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর অক্টোবরে এসে যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এডিস মশাবাহিত রোগটি। এ নিয়ে গত তিনদিনে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। তবে জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, এবার ডেঙ্গুতে বাবাকে হারাল আরফা। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৩০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এছাড়া, খুলনা বিভাগে ৩৭৬ জন, বরিশালে ২০০, চট্টগ্রামে ২১৬ জন, ময়মনসিংহে ১১০, রংপুরে ৩৮ জন এবং রাজশাহী ১৭৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৯৯৬

এদিকে গত মঙ্গলবার একদিনে চলতি বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখা গেছে ডেঙ্গুতে। এদিন ১০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এডিস মশাবাহিত রোগটি। তার আগের দিনও ৯ জনের প্রাণ গেছে এই ডেঙ্গুতে। এ নিয়ে চলতি মাসের প্রথম ছয়দিনেই ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে ভাইরাসটিতে। সব মিলিয়ে নিয়ে চলতি বছর মোট ২৮৯ জনের মৃত্যু হলো ডেঙ্গুতে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছে ১৪৮ জন। এছাড়া, অক্টোবরের প্রথম ছয় দিনে ৪৪ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯২ হাজার ২১৬ জন।

জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, ডেঙ্গুতে বাবাকে হারাল আরফা: জন্মের মাত্র তিন দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল আরিফিন ইসলাম আরফা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তার বাবা তাজুল ইসলাম। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মা-বাবার কোলশূন্য হয়ে এখন অথই সাগরে ৯ বছরের এই শিশুটি। রাজধানী ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটে।

আরও পড়ুন: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম ও মারুফা আক্তার উভয়েই একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রেমের সম্পর্ক থেকে ২০১৪ সালে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আরফার জন্মের পরপরই শারীরিক মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। নড়াইল থেকে যশোরে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার পথে পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তার মা মারুফা আক্তার। এরপর থেকেই দাদি সখিনা বেগম ও বড় চাচা শফিকুল ইসলামের কাছে রামপুরার ভাড়া বাসায় বড় হচ্ছিল আরফা। মা হারানো ছোট্ট মেয়েটিকে পরম যত্নে আগলে রেখেছিলেন তার বাবা তাজুল ইসলাম। মুদিদোকান পরিচালনার পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলারের দায়িত্ব পালন করা তাজুল মেয়ের সব আবদার পূরণ করতেন এবং মায়ের অভাব বুঝতে দিতেন না। পরিবারের সদস্যরা জানান, এর আগে যক্ষ্মা, করোনা ও চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক রোগ জয় করলেও শেষ পর্যন্ত সর্বনাশা ডেঙ্গু কেড়ে নিল তার প্রাণ। স্বামী ও সন্তানের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আর্থিক সংকট ও পাওনাদারদের দেনা শোধের চাপ। তাজুল ইসলামের কোনো সঞ্চয় না থাকায় এবং ঋণের বোঝা কাঁধে চেপে বসায় ছোট্ট আরফার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা দাদি ও চাচারা। বর্তমানে রাজধানীর রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে আরফা। মুঠোফোনে মা-বাবার পুরোনো ছবি দেখা আর প্রিয় বিড়াল ‘ভুতুম’কে নিয়ে দিন কাটানো এই শিশুর ছোট্ট মন এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি যে তার বাবা আর কোনো দিন ফিরবেন না। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আইসিইউ থেকেও সুস্থ হয়ে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে দিন কাটছে তার। পরিবারের এই চরম দুর্দিনে সমাজের বিত্তবান ও সরকারিভাবে কেউ পাশে দাঁড়ালে ছোট্ট আরফার ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও সুরক্ষা পেতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তার শোকার্ত স্বজনরা।