ইয়েমেনে বাড়ছে সংঘাত

সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৬ পূর্বাহ্ন, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, শারুরাহ সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রভাণ্ডার এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যেই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শারুরাহ সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রের গুদাম এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল হামলার প্রধান লক্ষ্য। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না: মাসুদ পেজেশকিয়ান

বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত মধ্যরাতে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হামলার তথ্য জানান। তবে তিনি ঠিক কোন সময়ে অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে, তা উল্লেখ করেননি।

এদিকে ইয়েমেনে হুথি ও সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি সপ্তাহে সংঘাত বাড়ার পর শনিবার সরকারি বাহিনী লোহিত সাগরের বন্দরনগর মোখায় হুথিদের অবস্থানে হামলার কথা জানায়। পরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, সেখানে হুথিদের অবস্থান ও ব্যারাক লক্ষ্য করে তিন দফা বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: মোদি-জিনপিং বৈঠকের আগে বন্ধুত্বের সুর, বদলাচ্ছে দিল্লি-বেইজিং সমীকরণ

হুথিদের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরবের ‘শত্রু বিমান’ ১২৯টি হামলা চালিয়েছে।

এরই মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাতে হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে পড়ে। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি মসজিদ, কয়েকটি ভবন ও যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায় হুথিরা। ওই অভিযানের শেষ পর্যায়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের অবশিষ্ট অংশ এবং কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথিরা সম্প্রতি সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরগুলোতে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহনে ব্যাঘাত তৈরি হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দাব এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিণত হয়েছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রিয়াদের আলোচনা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুই দফা ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ২০১৪ সালে। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত কিছুটা কমে এলেও জুলাইয়ে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর আগে ২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছিল। বর্তমানে দেশটি এডেনভিত্তিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

নতুন করে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা শনিবার জানিয়েছে, জুলাই থেকে সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা চার গুণ হয়েছে।

বৃহস্পতিবার মোখা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর সেখানকার বহু বাসিন্দা এডেনের দিকে চলে যান। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রতিবেশী জিবুতিতেও পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থনীতি ও অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালে।

উভয় পক্ষের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সৌদি আরবের কার্যত শাসকের সঙ্গে তার কথা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, হুথিরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছে যে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চায় না। তবে এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেননি।

এর আগে ২০২৫ সালে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে গোষ্ঠীটির বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু এরপরও হুথিরা ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপরও আবার হামলা শুরু করেছে তারা।

এদিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি-সমর্থকেরা ২১০ বন্দির মুক্তি উদ্‌যাপন করেছেন। হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া বিভিন্ন এলাকায় আটক এসব বন্দীর কেউ কেউ টানা আট বছর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন।