সানায় সৌদি জোটের হামলা

সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিতে হুথিদের ভয়াবহ হামলা

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৭:৫৯ পূর্বাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:০০ পূর্বাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। মঙ্গলবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত ভবনটিতে হামলার পর আগুন লাগলেও এতে হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হামলার কারণে সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে হামলায় ভবনটির কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।

আরও পড়ুন: ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর আলোচনা

এর আগে মঙ্গলবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনার আশপাশে থাকা কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানায় হুথি গোষ্ঠী। এসব স্থাপনাকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলেও উল্লেখ করে তারা।

ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় ইয়েমেন অয়েল কোম্পানির আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এর জবাবেই হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবকে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দেন।

আরও পড়ুন: নিরাপত্তা শঙ্কায় বাঙ্কারযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান বদলাচ্ছেন সৌদি যুবরাজ

সানায় তেল স্থাপনায় হামলা, রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত

আল-সাবাহ তেল স্থাপনা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের পরপরই সানায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর দেয় আল জাজিরার সংবাদকর্মীরা। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি সমর্থিত বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর ওই তেল স্থাপনা আক্রান্ত হয়েছে।

আল জাজিরার সংবাদদাতা ইউসুফ মাওরি জানান, সানায় তেল স্থাপনায় সৌদি হামলার সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একই সঙ্গে রাস ইসা বন্দরের তেলের ট্যাংক এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত হুদাইদা প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাতেও সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে বলে তিনি জানান।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির অভিযোগ, হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত হিসেবে ওই তেল স্থাপনা এবং ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ব্যবহার করছে।

অন্যদিকে, সানার তেল কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের সংরক্ষণাগারগুলো খালি ছিল। ফলে সেখানে হামলা হলেও তেলের মজুত কিংবা স্থানীয় বাসিন্দাদের সরবরাহে প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় শহরের কয়েকটি পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ইয়াহিয়া সারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানায় হামলা চালালে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ‘কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে। হুথিদের দাবি, জোট হামলা অব্যাহত রাখলে যেসব স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

এদিকে সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের দিকে যাওয়ার পথে প্রতিহত করেছে সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের এক মুখপাত্র।

বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় নিরাপত্তা সতর্কতা

সৌদি আরবে হামলার আশঙ্কায় মঙ্গলবার ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে আরামকো-সংশ্লিষ্ট একটি তেল শোধনাগারের আশপাশের লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর আগে শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রোববার বিমানবন্দরে আরেকটি হামলায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।

সপ্তাহান্তের এসব হামলার পর এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফ্লাইট স্থগিত করেছে।

মঙ্গলবার রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে সৌদি মন্ত্রিসভা হুথিদের হামলার জন্য পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিরা ‘খুব খারাপ আচরণ করছে’। সৌদি আরবের স্বার্থ রক্ষায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সহায়তা চাইতে পারেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ইয়েমেনে পাল্টা সামরিক অভিযান

ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দিয়ে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে পাল্টা অভিযানও চালানো হচ্ছে।

মঙ্গলবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের অবস্থান ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। তাইজ প্রদেশে মোট নয়টি হামলার দাবি করেছে তারা। এর মধ্যে ধুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

তাইজের দক্ষিণে আল-শাকাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই চলছে বলেও জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট তাইজ মিলিটারি অ্যাক্সিস মিডিয়া সেন্টার।

এদিকে ইয়েমেন নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমের অভিযোগ, আগের ২৪ ঘণ্টায় তাইজে হুথিদের হামলায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ১৭ জন। আবাসিক এলাকায় গোলাবর্ষণে অন্তত সাতটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

ইয়েমেনে সংঘাত বাড়তে থাকায় বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। সংস্থাটির সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিচ বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন সাধারণ মানুষ।

তার ভাষ্য, ইয়েমেনে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে জাতিসংঘ।


সূত্র: আলজাজিরা