অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত ‘কেবিনেটের বাইরে’ হতো: সাখাওয়াত হোসেন
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়মিতভাবে কেবিনেট বৈঠকে না নিয়ে বাইরে আলোচনা করে নেওয়া হতো। দায়িত্ব ছাড়ার পর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, কেবিনেটে ভিন্নমত থাকলেও তা মূলত ছোটখাটো বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকত। সূচি সংশোধন বা প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হয়েছে, তবে বড় সিদ্ধান্তগুলো আনুষ্ঠানিক কেবিনেট আলোচনায় আসত না। তার ভাষায়, এসব সিদ্ধান্ত ‘কেবিনেটের বাইরে’ নির্ধারিত হতো।
আরও পড়ুন: জামায়াতের ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন তারেক রহমান
‘কিচেন কেবিনেট’ প্রসঙ্গ
সাখাওয়াত হোসেন জানান, সব সরকারের ক্ষেত্রেই একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকার কথা শোনা যায়। তবে সেখানে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ওই পরিসরে তিনি নিজে ছিলেন না। তার ধারণা, নীতিগত অমিলের আশঙ্কায় তাকে ওই আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের নাম তিনি প্রকাশ না করলেও ইঙ্গিত দেন, তারা তার সহকর্মী ছিলেন।
আরও পড়ুন: দেশের নাজুক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কর বাড়ানোর প্রয়োজন: অর্থমন্ত্রী
পুলিশ পুনর্গঠন ছিল প্রধান লক্ষ্য
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। বহু থানা লুট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল। পুলিশের একটি অংশ মাঠে নামতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছিল। তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তিনি জানান, ট্রাফিক পুলিশও দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখিয়েছিল। পরবর্তীতে উৎসাহ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের কাজে ফিরিয়ে আনা হয়।
লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ
সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, অস্থির সময়কালে প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু উদ্ধার হলেও এক হাজারের বেশি রাইফেল ও পিস্তল তখনও নিখোঁজ ছিল। এসব অস্ত্র বর্তমান সরকারের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ
কেন তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হলো—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, একটি বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রচারিত হওয়ায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। তার মতে, সে সময়ের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, পরিস্থিতি পরবর্তীতে আরও জটিল হয়েছে।
দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেও তাকে থাকতে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, অল্প সময়ের মধ্যে চলে গেলে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে—এ যুক্তিতে তাকে দায়িত্বে রাখা হয়।
৭.৬২ বুলেট ও টাইপ-৩৯ রাইফেল ইস্যু
৭.৬২ মিমি বুলেট ও চাইনিজ টাইপ-৩৯ রাইফেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয়নি। কিছু ভিডিওচিত্রে পুলিশের রাইফেল ব্যবহার করে গুলি চালানোর দৃশ্য দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব অস্ত্র সাধারণত সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়—কবে ও কীভাবে এগুলো পুলিশের কাছে এলো, তা তদন্ত হওয়া উচিত ছিল বলে মত দেন তিনি।
সন্দেহজনক ছবি ও বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ
তার কাছে কিছু সন্দেহজনক ছবি রয়েছে বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন, যেখানে কয়েকজনের চেহারা স্থানীয়দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেন তিনি। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে তোলার দৃশ্যও নাকি দেখা গেছে—যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
বিদেশি প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে না হলেও কিছু বিষয়ে চাপ ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য আলোচনা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাবের ইঙ্গিত দেন তিনি। অতীতে নীতিনির্ধারণ অনেকটাই দিল্লিকেন্দ্রিক ছিল বলেও মন্তব্য করেন।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নির্বাচন নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পৃথিবীর কোথাও শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয় না। দেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একটি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পাওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে আখ্যা দেন।
চুক্তি ও ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’
বিভিন্ন চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো গোপন চুক্তি হয়নি। এসব সাধারণত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পিপিপি অথরিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং তাতে ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ থাকতে পারে। একটি বিদেশি কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের পাঁচ শতাংশ ইস্যুতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল বলেও জানান তিনি।





