গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারণায় সিএসআর তহবিল ব্যবহার: ৪ কোটি টাকার ব্যয়ে আইনি প্রশ্ন

Any Akter
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ন, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৫:৫৭ অপরাহ্ন, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অন্তত ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগে তীব্র আইনি ও নৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্ধারিত খাতের বাইরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই অর্থ ব্যবহার বিদ্যমান নীতিমালার পরিপন্থী এবং আর্থিক সুশাসনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নির্দেশনার কথা বললেও, বিষয়টি এখন আইনি পর্যালোচনা ও জবাবদিহিতার দাবিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সিএসআর তহবিল থেকে কোটি টাকার প্রবাহ: 

আরও পড়ুন: মুক্তির কাফেলায় শরিক হয়ে ফ‌্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একসাথে বাঁচতে হবে: চীফ হুইপ

গণভোটকে কেন্দ্র করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ বিতরণের তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,

‘স্টুডেন্ট এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন’ নামে সদ্য নিবন্ধিত একটি সংগঠন ১২ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দেয়, যার মধ্যে ১ কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়।

আরও পড়ুন: সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৩৯ হাজার ৩৯৮ হজযাত্রী

‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’ পায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ পায় ২০ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে অন্তত ৪ কোটির বেশি অর্থ ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান ও দায় প্রশ্নে বিতর্ক: 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সিএসআর তহবিল বোর্ড অনুমোদিত হওয়ায় তা ব্যয়যোগ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি—সরকারের নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই এই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানেই মূল আইনি প্রশ্ন:

সিএসআর তহবিল কি রাজনৈতিক বা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহারযোগ্য?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সিএসআর ব্যয়ের নির্দিষ্ট খাত হলো—

★শিক্ষা (৩০%)

★স্বাস্থ্য (৩০%)

★পরিবেশ ও জলবায়ু (২০%)

★ সামাজিক উন্নয়নসহ অন্যান্য খাত (২০%)

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী বা গণভোট প্রচারণা এই কাঠামোর কোনো খাতেই পড়ে না।

‘চাপ প্রয়োগ’ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের অভিযোগ: 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সূত্র জানায়, ১১ জানুয়ারির এক বিশেষ বৈঠকে গভর্নর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে গণভোট সফল করতে চাপ দেওয়া হয়। যদিও বৈঠকের এজেন্ডায় বিষয়টি ছিল না, তথাপি সিএসআর তহবিল ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের প্রশাসনিক প্রভাব ব্যাংকিং খাতের স্বাধীনতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা: 

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “সিএসআর তহবিল রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার সরাসরি নীতিমালার লঙ্ঘন। এটি ভবিষ্যতে তহবিল লুটপাট ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের অন্যান্য বৈধ খাত থেকে ব্যয় না করে সিএসআর তহবিল ব্যবহার করা হয়েছে সম্ভাব্য অডিট এড়ানোর উদ্দেশ্যে—যা আরও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

ছাত্র সংগঠনের ভেতরেই অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব: 

গণভোট প্রচারণার অর্থায়ন নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভেতরেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সংগঠনের সাবেক মুখপাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে ( ২৩ এপ্রিল)  সিনথিয়া জাহীন আয়েশা অভিযোগ তুলে বলেন, 

প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত অর্থায়নের কথা বলা হলেও পরে একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অন্তত ১ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়, যার হিসাব স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

তিনি দাবি করেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও এই অর্থের বিস্তারিত গোপন রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক সংযোগ ও নতুন বিতর্ক: 

এই অর্থ বিতর্কের মধ্যেই সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ নেতা জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়েছেন, যা পুরো ঘটনাকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম স্থগিত করে নতুন কাঠামো গঠনের ঘোষণা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

আইনি মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য পরিণতি: 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রযোজ্য হতে পারে—

আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যব

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন

নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ:  

প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি

তারা বলছেন, প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা স্বাধীন অডিট কমিশন গঠন করা উচিত। 

গণভোটকে কেন্দ্র করে সিএসআর তহবিল ব্যবহারের এই ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাত, আর্থিক সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—তিন ক্ষেত্রেই গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারের নির্দেশনা থাকলেও আইন ও নীতিমালার ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এমন বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।