চালু হচ্ছে বন্ধ সরকারি ৪৪ শিল্প কারখানা
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা পাঁচটি সরকারি কর্পোরেশনের অধীন ৪৪ শিল্পকল-কারখানা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এগুলো চালু হলে কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও তারল্যের সুযোগ তৈরি হবে। দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি প্রাণচাঞ্চল্য হয়ে উঠবে গ্রামীণ অর্থনীতি। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিনের টাইমলাইনে বন্ধ কলকারখানা চালু করে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ডিসেম্বরের মধ্যে চালুর নির্দেশনা দিয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিল্প, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অব্যাহত লোকসানের প্রেক্ষিতে দেশে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালু করে দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কর্পোরেশনগুলোতে চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অকেজো হয়ে পড়া কলকারখানাগুলো চালু করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৩ মন্ত্রীকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, বেসরকারিকরণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং এসব কারখানা চালু করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকায় প্রথম সফরেই ইতিবাচক বার্তা দিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর
বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সরকারি শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে কার্যক্রমে গতি আনা এবং এসব শিল্পকারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া বৈঠকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি সব কলকারখানার জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে সেখানে নতুন করে বিনিয়োগ করবেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
এই কমিটির সর্বশেষ সভায় ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জমির পরিমাণ, অবকাঠামো, বন্দর ও মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনার বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রেজেন্টেশন তৈরি করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত করে একটি এসওই (স্টেট-ওনড এন্টারপ্রাইজ) ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও তৈরি করছে সরকার।
দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে ১০ হাজার একরের বেশি জমি। সেখানে রয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় শিল্প অবকাঠামো। ইতোমধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব স্থাবর সম্পদের ব্যবসায়িক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। উদ্যোক্তারা আগ্রহ প্রকাশ করে পরিকল্পনা দিচ্ছেন। কারখানাগুলো চালু হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
সরকার বলছে, নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান কারখানা ও শিল্পভূমি ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এ জন্য যৌথ উদ্যোগ (জেভি), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), দীর্ঘমেয়াদি ইজারা কিংবা কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত পাঁচ সরকারি কর্পোরেশনের আওতায় ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এসব শিল্পকারখানার বেশির ভাগই দেশের প্রধান শিল্প করিডরে অবস্থিত। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো বিদ্যমান রয়েছে কারখানার অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক দক্ষ জনবল। দ্রুত কলকারখানা চালু করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, 'বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।'
যেসব প্রকল্পে বেশি সম্ভাবনা
সরকারি উপস্থাপনায় কয়েকটি প্রকল্পকে বিশেষ সম্ভাবনাময় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (পিআইএল) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড কারখানায় ২৪ দশমিক ৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ১০ একর অব্যবহৃত রয়েছে। বর্তমানে সেখানে সীমিত পরিসরে গাড়ি সংযোজন হলেও ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ অটোমোবাইল উৎপাদন কারখানা, আধুনিক বডি ও পেইন্ট শপ এবং বৈদ্যুতিক যান (ইভি) সংযোজন লাইন স্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (জেমকো) ১২২ দশমিক ৯৬ একর জমির একটি বড় অংশ অব্যবহৃত। সরকার সেখানে আধুনিক পরিবেশবান্ধব ট্রান্সফরমার উৎপাদন কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা দেখছে। বর্তমানে দেশে ট্রান্সফরমারের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়।
অন্যদিকে, টঙ্গীতে অবস্থিত এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডের মোট ৯ দশমিক ৬২ একর জমির প্রায় ৬৪ শতাংশই খালি। দ্রুত বাড়তে থাকা বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের বাজারকে সামনে রেখে সেখানে উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বগুড়ার ছয়পুকুরিয়ায় বছরে তিন লাখ টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক গ্রিন স্টিল মিল স্থাপনেরও প্রস্তাব রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ১৫ দশমিক ২৬ শতাংশ পাওয়া গেছে বলে সরকারি উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বন্ধ কলকারখানাগুলো দ্রুত চালু করতে সরকারি পাঁচটি কর্পোরেশনে চলতি মাসে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের এ-সংক্রান্ত ব্রিফিং করে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।





