৪ আগস্ট ২০২৪: রক্তাক্ত দিন, ‘মার্চ টু ঢাকা’ ও সরকার পতনের টার্নিং পয়েন্ট
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তাক্ত দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচিকে ঘিরে সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। একই দিনে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এর আগে ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত গণজমায়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তবে ৪ আগস্ট দেশব্যাপী সংঘর্ষ ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে রাতেই আন্দোলনের সমন্বয়করা কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালনের ঘোষণা দেন। আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ পৃথক বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানান এবং ছাত্র-জনতাকে ঢাকামুখী হওয়ার আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন: হাদির হত্যা মামলার আসামি ও শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান
সেদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীরা রাজপথে অবস্থান নেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে সংঘর্ষে ৯৮ জন নিহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা সদর, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রবেশ সীমিত করা হয়।
আরও পড়ুন: চুপ্পু-এস আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ৬ আগস্টের ঘোষিত কর্মসূচি ঘিরে সরকার নিরাপত্তা পরিকল্পনা জোরদার করেছিল। পরে আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত সরকারের প্রস্তুতিকে অকার্যকর করে দেয় এবং আন্দোলনের গতি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যাও ছিল।
এদিকে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা সশস্ত্র বাহিনীকে ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক বাংলাদেশে সহিংসতা দ্রুত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন।
পরদিন ৫ আগস্ট সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঢাকামুখী হতে শুরু করেন। পরে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন এবং সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার ঘোষণা দেন। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া আন্দোলন ৫ আগস্ট সরকার পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ৩৬ দিনের এই আন্দোলনে এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।





