স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা: ৫৫ বছরে বঙ্গভবনের নেতৃত্বে যারা
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে একাধিক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের কেউ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, কেউ সংসদ সদস্যদের ভোটে, আবার রাজনৈতিক ও সামরিক পটপরিবর্তনের সময় কেউ ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯১ সালের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থাও ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব পালনকারীদের তালিকায় একই ব্যক্তি একাধিকবারও এসেছেন।
আরও পড়ুন: বহু বছর পর যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাচ্ছি: আসিফ নজরুল
মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তিনিই মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
আরও পড়ুন: অ্যান্ডি হলকে ৫ লাখ রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ মালয়েশিয়ার হাইকোর্টের
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাঁর পদত্যাগের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মোহাম্মদউল্লাহ। ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২৭ জানুয়ারি শপথ নেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পালাবদল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ৮৩ দিন তিনি রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন। এরপর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সংসদ ও মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং দেশে সামরিক আইন জারি করেন। একই সঙ্গে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন।
১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়াউর রহমানকে এ পদে নিয়োগ দেন। পরের বছর ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমানের হাতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়ে অবসর নেন।
জিয়াউর রহমান ও আবদুস সাত্তার
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাব পান। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। একই বছর ১৫ নভেম্বরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হন।
এরশাদের সামরিক শাসন
এরশাদের ক্ষমতা দখলের কয়েক দিন পর ২৭ মার্চ আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর দলটির মনোনয়ন নিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এরশাদের শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি সংসদ ভেঙে দেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচনও প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়েন।
সাহাবুদ্দিন আহমেদ ও গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন
এরশাদের পদত্যাগের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি আবার প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তাঁকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ১৯৯১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য আবদুর রহমান বিশ্বাস। প্রায় পাঁচ বছর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বি. চৌধুরী থেকে ইয়াজউদ্দিন
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, যিনি বি. চৌধুরী নামে পরিচিত। ২০০২ সালের ২১ জুনের একটি বিতর্কিত ঘটনার পর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব নেন। পরের বছর ১১ জানুয়ারি তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন।
জিল্লুর রহমান ও আবদুল হামিদ
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন জিল্লুর রহমান। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময় আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে অসুস্থতার কারণে ১৪ মার্চ তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন এবং দ্বিতীয়বারও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁর দুই মেয়াদ মিলিয়ে তিনি দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ২৪ এপ্রিল বঙ্গভবনে জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে শপথ পড়ান। তিনি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে তিনি ব্যাপক চাপের মুখে পড়েন। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব পালনকারীদের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠন, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল—প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত রয়েছে বঙ্গভবনের এই দীর্ঘ ইতিহাস।





