‘পিংক বাস’ চালুতে নগরীতে উচ্ছ্বাসে নারীরা

Sadek Ali
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৮:০৩ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:০৩ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# নারীদের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি পথে ১৪টি বাস 

# বাসগুলো পরিচালনা করছেন নারী চালক ও নারী সহকারীরা

আরও পড়ুন: দেশে হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত, প্রাণহানি বেড়ে ৯১৮

রাজধানীতে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু হওয়া ‘পিংক বাস’ সেবা প্রথম দিনেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। বনানীর নতুন বিমানবন্দর সড়কে বলাকা পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় এ ঘটনা ঘটে। গতকাল মঙ্গলবার ঘটনার পর ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বলাকা বাসের বিরুদ্ধে জরিমানা করে।

এদিকে এই ঘটনার বেশ কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর বনানী এলাকায় পিংক বাসটি পৌঁছানোর পরপরই বলাকা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ধাক্কার ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ট্রাফিক পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং বলাকা বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে জরিমানা করে। মূলত নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ তিন জেলায় বিশেষ ‘পিংক বাস’ সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।

আরও পড়ুন: মহাসড়কে এআই ক্যামেরার নজরদারিতে কমবে চাঁদাবাজি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রসঙ্গত, গাজীপুর বিআরটিসি ট্রেনিং সেন্টারে তাঁরা গাড়ি চালানো শেখেন। প্রত্যেকেই ছাত্রী। মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ে তাঁরা এসেছিলেন নারীদের জন্য বাস সার্ভিসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। কারণ, এই বাসগুলো পরিচালনা করবেন নারী চালক ও নারী সহকারীরা। ভাড়া তুলবেন নারীরা। বাসের যাত্রী থাকবেন শুধু নারীরা। ছাত্রীদের একজন নাজমুন ইসলাম গাজীপুরের বিজিআইএফটি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে বিবিএ করেছেন। তনি বলেন, গণপরিবহনে নারীদের বিভিন্ন সময়ে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। নারীদের পরিচালিত নারী বাস সার্ভিস হওয়ায় এই ভয় থাকবে না। নিশ্চিন্তে বাসে উঠতে পারব। তিনি জানান, তিনি বাসের নিয়মিত যাত্রী। দেখা যায়, সকালের দিকে বাসে জায়গা থাকে না, আবার অনেক সময় বাসে মেয়েদের নিতে চায় না। ফলে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো যায় না, কর্মস্থলে পৌঁছানো যায় না। তাঁর মতে, শুধু ঢাকার ভেতরে যেন না হয়, ঢাকার বাইরেও এই বাস দরকার। তাই বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে মহিলা বাস সার্ভিসের (পিংক বাস) উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, এই সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল নারীদের পরিচালনায় বিশেষ বাস চালু। উদ্দেশ্য ছিল, নারী বাসে ওঠার আগে ও পরে নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে। বাসের জন্য অপেক্ষার সময় নারীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়, বাসের মধ্যে অস্বস্তির পরিবেশ হয়, বাস থেকে নামার পর নিরাপদ ঝুঁকিতে পড়ে নারীরা। এ কারণে নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজনে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার ছিল। ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও ৯টি দ্বিতল বাস চলবে। বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। তিন জেলায় ১৩৪টি স্থানে বাসগুলো থামবে। পরে বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে, রুট সম্প্রাসারণ করা হবে। ২০০ ইভি (ইলেকট্রনিক বাহন) বাস আসবে। এর মধ্যে ১০০ বাস থাকবে নারীদের জন্য। অন্য বিভাগেও নারী বাস সার্ভিস চালু হবে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আবদুল লতিফ মোল্লা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা হয় কয়েকজন নারী যাত্রীর সঙ্গে। মীম নামের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের এক ছাত্রী বলেন, অনেক সময় বাসে আসন পাওয়া যায় না। দাঁড়িয়ে যেতে হয়। বাসের ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় খারাপ স্পর্শের শিকার হতে হয়। নারীদের জন্য দেওয়া বাসে উঠে এসব হয়রানির মুখে পড়তে হবে না। গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মৃদুতা আওয়াল বলেন, নারী বাস সার্ভিসের এই উদ্যোগ খুব ভালো। বাসের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত। তাঁর মতে, নারীরা বাস চালক হবে, এ নিয়ে অনেকে নেতিবাচক মন্তব্য ছড়াচ্ছে। এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ থেকে বিরত থাকা উচিত। বাস চালু হওয়ার ঠিক আগে আগে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে বাসে ওঠেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, আমার ভালো লাগছে। এখানে যাত্রীরা যাত্রার জন্য উৎসাহিত হয়ে এসেছে। এ যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য যা যা করণীয় তা মন্ত্রণালয় থেকে করতে পারলে ভালো লাগবে। বাসের চালক মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন বলেন, তিনি বিআরটিসিতে ছোট বাহন চালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখন নারী বাসের চালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি এমএ পাস। পরিবারে মা–বাবা, স্বামী ও শিশুসন্তান রয়েছে। বাস চালাবেন এটা শোনার পর পরিবার থেকে আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু তিনি মনে করেন সব কাজ সবার জন্য। তাই তিনি এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। বাস চলাচল শুরুর পর সুমাইয়া নামে একজন যাত্রী বলেন, আমরা সুন্দরভাবে চলাচল করতে পারব। চাকরিজীবী সাদিয়া আফরিন বলেন, নারী বাসে নারীরা নিরাপদে চলতে পারব। কোনো হয়রানির শিকার হবো না বলে আশা করি।’ সীমা আক্তার নামে আরেক যাত্রী বলেন, এখন থেকে হেনস্তা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব, সেটা ভেবেই স্বস্তি লাগছে। তবে দ্রুত বাসের সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বাসের চালক জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল রুটে বাস চালাবেন। এমন একটি দিনের সাক্ষী হয়ে তাঁর ভালো লাগছে।

তবে এর আগেও ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করা হয়েছিল। তবে তা সফল হয়নি। বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চালু হয় ১৯৯৮ সালে। নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর এই বাসসেবা উদ্বোধন করা হয়। রুট ছিল ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। মোট ১২টি বাস থাকলেও ৪-৫টির বেশি রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যেত না। নারী যাত্রীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তাঁরা বাসের দেখা পেতেন না। কিছু বাস নারীদের লিজ দেওয়া হয়। বাসের চালক থাকতেন পুরুষ। এক নারী উদ্যোক্তা ক্ষতির মুখে লিজ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এমন ঘটনাও ঘটেছিল। ২০০৯ সালে আবার এই সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা তেমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এবার বাস সার্ভিস চালুর পর সে রকম ঘটনার যেন পুনারাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন নারী যাত্রীরা। তাঁরা বলেন, বিভিন্ন কারণে আগের বাস সার্ভিস সফল হয়নি। ব্যবস্থাপনা ভালো হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে নারী বাস সার্ভিসের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচক হওয়া দরকার।