শৃঙ্খলা ও ইমেজ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা
- দেশ ও জনগণের কল্যাণময় কাজে থাকতে হবে নেতাকর্মীদের।
- শৃঙ্খলা ফেরাতে এমপি মিষ্টি ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক৷ আউট।
- অপকর্মে জড়ালে নেতা-এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা।
দীর্ঘ দুই দশক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনীতিক দল বিএনপি ত্রয়োদশ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারী এককভাবে সরকার গঠন করে। এই সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে ক্ষমতায় আসার পর পরই দলটির এমপি-মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। দল ও সরকারের ক্লিন ইমেজ ফিরিয়ে আনার লক্ষে কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন দলীয়প্রধান। হুসিয়ারি দেন, অপকর্মে জড়ালে নেতা-এমপি-মন্ত্রী কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। বিএনপিতে শুরু হয় নানা হিসাব-নিকাশ। এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দলীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) এবং নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: পদত্যাগ করলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন
সর্বশেষ রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় ‘মাদকবিরোধী অভিযান’-এর সময় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। এরআগে রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ এর উপনির্বাচন আগামী ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন দলটির বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল। গত জুলাই মাসে শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে ময়মনসিংহ-১১ আসনের এমপি ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিএনপি। তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল। তিনি অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। পুলিশ সজীবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে পরিবারের জিম্মায় মুক্তি দেয়। যুবদল তাকে বহিষ্কার করেছে। সজীব ও তার পরিবারের সদস্যরা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আরও পড়ুন: নিজের সন্তানের জন্য হলেও ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখুন: প্রধানমন্ত্রী
দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, ইশরাক ও মিষ্টির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলীয় নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় পদ কিংবা সরকারি দায়িত্বে থাকা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করা হবে না—মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় এমন বার্তাই সামনে এসেছে। তবে বিএনপি ও চার সংগঠনের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, গত ৫ আগস্টে বিএনপি’র এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সারা দেশে একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং দখলের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগে ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তরুণ, মেধাবী এবং সংগঠনের জন্য ভালো ইমেজ রাখা নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামী রাজপথে থাকা নেতাদেরও মূল্যায়ন করা হবে। সংগঠনকে গতিশীল করা এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে সময় নিচ্ছেন বিএনপি’র হাইকমান্ড।
বিএনপি’র অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের লক্ষে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং ছাত্রদলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আভাস দেন দলের হাইকমান্ডও। নতুন কমিটির আশায় এই চার অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিরাজ করছে স্থবিরতা। আটকে আছে সাংগঠনিক অনেক সিদ্ধান্ত। এরমধ্যে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এবং স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করেছেন। একজন ব্যতীত সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এজন্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি’র হাইকমান্ড।
এ ছাড়া ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের ডেকে নিয়ে নতুন কমিটি দেয়ার বার্তা দেন বিএনপি প্রধান। বিএনপি’র হাইকমান্ডের এমন বার্তার পর ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত দেন। ওই ঘোষণার তিন মাস অতিবাহিত হলেও ছাত্রদলের নতুন কমিটি আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি রাড্ডাকাণ্ডে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেয়া হয়েছে। শিগগিরই নতুন কমিটি গঠন করা হবে বলে তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সংগঠনের ভেতর আলোচনা উঠে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে। এসব সংগঠনের কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপিতে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। মূলত ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্তের কারণে কমিটি গঠনে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অপকর্মে জড়ালে নেতা-এমপি-মন্ত্রী কারও ছাড় নেই: এরইমধ্যে দলের নেতা-কর্মী ও সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো নেতা-কর্মী, এমপি-মন্ত্রী কেউ কোনো অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাঁদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। গত রোববার বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তারেক রহমান এমন কঠোর বার্তা দেন বলে জানা গেছে।
সভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক সংসদ সদস্য (এমপি) জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার গঠনের পর আট মাসে কী কী কাজ হয়েছে, কোন কাজের অগ্রগতি কতটুকু ও কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে, এসব বিষয়ে এমপিদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকার সমস্যার বিষয়েও এমপিদের কথা শুনেছেন তিনি। নাম প্রকাশ না করে এক এমপি বলেন, সরকার গঠনের পর গত আট মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী কাজ হয়েছে, সেসব কাজের অগ্রগতি কতটা ও বাস্তবায়নে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি না, তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া এমপিদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা ও মানুষের প্রত্যাশার বিষয়েও খোঁজ নেন তিনি। সরকারের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে জানতে এমপিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই আলোচনা হয়েছে বলে জানান ওই এমপি। জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে।
মনোনীত প্রার্থী হারলে ওই ইউনিয়নে কোনো কাজ করব না: জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দলীয় মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী না হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে উন্নয়নকাজ করবেন না তিনি। তাঁর এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় বামনা আসমাতুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা বিএনপির কর্মিসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী না হলে আপনাদের আলমারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অন্য কেউ জয়ী হলে আমার কাছে আসতে পারবেন না, আমি কোনো কাজ দেব না। ওই ইউনিয়নের কপাল পুড়বে। দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তিনি জয়ী না হলে ওই ইউনিয়নে কোনো কাজ হবে না। তিনি বলেন, অনেক কাজ দিয়েছি। সেসব কাজ শুরু হবে। কিন্তু যদি দেখি দলীয় প্রার্থী জয়ী হননি, তাহলে ওই ইউনিয়নে সত্যিই আমি কাজ করব না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হওয়ার, তা আগেই হয়ে গেছে এবং আরও আগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই রাজনৈতিক মাশুল হয়তো কিছুটা কম হতো। কথা হয় ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এর সঙ্গে।
তিনি বলেন, ফেরদৌসীর পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি একটি জোরালো বার্তা হলেও, এটি আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং অন্যান্য পদধারীদের আরও সতর্ক করবে। তিনি যোগ করেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা উচিত। একইসুরে কথা বলেছেন জাবির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন,ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া মাত্র, কিন্তু এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।





