গুরুতর সব অপরাধ বাড়াচ্ছে মাদক
* রাজধানীতেই একের পর এক খোঁজ মিলছে মাদক তৈরির কারখানার
* এসবির এসআইকে হত্যার সময় অভিযুক্তরা মাদকাসক্ত ছিল
আরও পড়ুন: ফের উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ
* বর্তমানে দেশের ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে
* নতুন নতুন মাদক বাজারে প্রবেশ করছে নানা পথে
আরও পড়ুন: নিয়োগ-বদলি থেকে টেন্ডার বাণিজ্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
* এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে
* মাদক কারবারে নারীর সংখ্যা বাড়ছে
সারা দেশে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েই চলেছে। আর এসব অপরাধের সাথে জড়িতদের অনেকেই মাদকাসক্ত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে মাদক পাওয়া যায় না। আগে বেচাকেনা হতো খুব গোপনে। বর্তমানে সারা দেশে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়রাও ভয়ে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারছেন না। অফলাইন কিংবা অনলাইন-সব লাইনে মাদকের সরগরম উপস্থিতি দৃশ্যমান। মাদককে কেন্দ্র করে এক বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, যা অত্যন্ত ভয়ের ও আতঙ্কের। মাদকের জন্য টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের মত গুরুতর অপরাধও করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এর সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের একটা অংশ জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও একটি অংশ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, দেশে খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে মাদক। প্রতিদিন গড়ে দেশে ১০ থেকে ১২টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী খুনের সংখ্যা প্রতিদিন দ্বিগুণ হারে বাড়ছে! এসব নৃশংস খুনের সঙ্গে মাদক জড়িত বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। তারা বলেন, মাদকাসক্তরা একজন মানুষ, তা-ও তারা ভুলে যায়। মাদকই তাদের জীবনের আনন্দ বিনোদনসহ সব অপকর্মের সঙ্গী। ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে (৫৮) পিটিয়ে হত্যার সময় অভিযুক্তরা মাদকাসক্ত ছিল বলে জানিয়েছে র্যাব।
গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
র্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, এটা মূলত বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা। ঘটনার সময় অভিযুক্তরা সবাই মাদকাসক্ত ছিলেন। আলতাব হোসেন গ্যারেজে বৃদ্ধকে মারধর করতে দেখলে মানবিকতা দেখিয়ে সেখানে প্রতিবাদ করেন। যার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্তরা তার ওপর হামলা করে। গত শনিবার রাতে আমিনবাজারে আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার কারণ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরে র্যাব। ব্রিফিংয়ে বলা হয়, সেদিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় একটি প্রাইভেটকারের চালক এবং তার কয়েকজন সহযোগী অটোরিকশা গ্যারেজের মালিককে মারধর করার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।
র্যাব জানায়, অটো রাখাকে কেন্দ্র করে অটোরিকশা গ্যারেজের মালিককে মারধর করার সময় এসআই আলতাব হোসেন প্রতিবাদ করেন। এ সময় গ্যারেজের মালিককে মারধরকারীদের সঙ্গে আলতাবের বাগবিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আলতাব নিজের পরিচয় দেন। এতে আসামিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে আলতাব দৌঁড়ে তার ছেলের পোশাক কারখানার ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা সেখানেও চড়াও হয়। তারা আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে এনে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকে। র্যাব আরও জানায়, পরে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা দিয়ে আলতাব ও তার ছেলে আরিফুলকে মারধর করে। এ সময় কারখানার ভেতরে থাকা মেশিন ও আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলতাবকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সাভার মডেল থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন বলে জানায় র্যাব। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে আটজনকে র্যাব ও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
র্যাব যে আটজনকে গ্রেফতার করেছে তাদের মধ্যে চারজনকে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা থেকে এবং বাকি চারজনকে সাভারের আমিনবাজার এলাকা থেকে। র্যাব-১০ এর অধিনায়ক জানিয়েছেন, গ্রেফতার আপন কিশোর গ্যাং-এর মূলহোতা ও মাদক সাপ্লায়ার। তার নামে বিভিন্ন থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। ঘটনার সময় তিনি এসআই আলতাবকে এসএস পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করে। এ ছাড়া গ্রেফতার জিহাদ চাকু দিয়ে তাকে মারাত্মক জখম করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পরিবারকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একজন মাদকসেবীর কারণে অশান্তিতে থাকে পুরো পরিবার। নেশার টাকা জোগানোর জন্য চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায় অনেক মাদকাসক্ত। ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধের ঘটনায় তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে মাদক সেবনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কুশ, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক রাজধানী ও বড় শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এতে সামাজিক ও পারিবারিক কলহও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের মতো পরিচিত মাদকের বাইরে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদকের বাজার। গত এক দশকের বেশি সময়ে একের পর এক নতুন মাদকের সন্ধান মিললেও সেগুলো শনাক্ত, উপাদান বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের। মাদকের ধরন বদলের পাশাপাশি বদলেছে এর সরবরাহের কৌশলও। নতুন নতুন মাদক বাজারে প্রবেশ করছে নানা পথে। অনেক ক্ষেত্রে এসব মাদক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার আগেই তা ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্তপথের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার, ফরেন পোস্টাল ও আন্তর্জাতিক দ্রুত ডাকসেবা (ইএমএস) ব্যবহার করে বিদেশ থেকে মাদক দেশে ঢোকার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ফলে চেনা মাদকের পাশাপাশি অচেনা মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রচলিত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বাইরে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সাম্প্রতিক অভিযানে ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’, এলএসডি, ডিএমটিসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে।
দেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই তরুণ। সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জুনে খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারাদেশে ১৮ হাজার ৮২০টি মামলা হয়। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার সংখ্যা ছয় হাজার ৫৮০টি, যা মোট মামলার প্রায় ৩৫ শতাংশ। কারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, ২৯ জুলাই দেশের সব কারাগার মিলিয়ে বন্দি ছিল ৯৩ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে মাদক-বিষয়ক মামলায় বন্দি ১৭ হাজার ৮১৯ জন, যা মোট বন্দির ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ জন, নারী ৫৯৩ জন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে চারটি এবং বেসরকারি ৩৮৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে এসব মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ২১ হাজার আটজন মাদকাসক্তকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
একসময় ভারত-মিয়ানমার থেকে আসতো ফেনসিডিল ও ইয়াবা। আর এখন রাজধানীর কাছেই তৈরি হচ্ছে ইয়াবাসহ নানা মাদক। এ বছর অন্তত ৬টি মাদক কারখানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কয়েক বছরে পাওয়া গেছে ১০টিরও বেশি। অভিযানে মিলেছে, আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে তৈরি হচ্ছে বিদেশি মাদক কুশ, কেটামিন, ইয়াবা ও ভেজাল মদ। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো বলছে, এসব মাদকই ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীতে। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে মাদক আসার খবর এখন পুরনো। রাজধানীতেই একের পর এক খোঁজ মিলছে অবৈধ মাদক তৈরির কারখানার। এসবের পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি চক্র। এই যেমন, ওয়ারীর এক বাসায় ছিল কুশ চাষের বিশেষ ল্যাব। আড়ালে রাখতে ব্যবহার করা হতো কৃত্রিম আলো, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। তদন্তে উঠে আসে, এই ল্যাবের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এক ব্যক্তি, প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবটি তদারকি করতেন তিনি। একই দিনে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পাওয়া যায় ভেজাল মদের কারবার। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে নানা ব্রান্ডের মদ তৈরি, বোতলজাত ও সংরক্ষণের কাজ চলে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াবা কারখানার সন্ধান মেলে গাজীপুরের টঙ্গীতে। জব্ধ করা হয় কাঁচামাল ও নানা সরঞ্জাম। মার্চে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে অভিযানে কেটামিনের ল্যাবের সন্ধান পায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখানে এক চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। আর জব্দ করা হয় ৬ কেজির বেশি কেটামিন।
জুলাই ও আগস্টে কেরানীগঞ্জের দুই এলাকায় ইয়াবা কারখানার সন্ধান পায় র্যাব। সেখানে যন্ত্রপাতি বসিয়ে তৈরি হতো মাদক। চক্রের সদস্যরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে, দেশেই বানায় এসব যন্ত্র। এই দুই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় কয়েকজনকে। ঢাকায় মাদক তৈরির এমন কর্মযজ্ঞে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হতবাক। এই প্রেক্ষাপটে, মাদক প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসছে প্রচুর। তরুণ-কিশোররাই বেশি ইয়াবা আসক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও বিভিন্ন পণ্য চোরাচালান হয়ে আসছে। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার পর এই অবৈধ বাণিজ্যের ধরন বদলাতে শুরু করে। একদিকে সীমান্তের ওপারে খাদ্য, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট, অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে তুলনামূলক সহজলভ্য পণ্য—এই দুইয়ের ফারাক কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান অর্থনীতি। এই অর্থনীতির কেন্দ্র এখন শুধু নাফ নদ নয়, যুক্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ নৌপথ। মাছ ধরার ট্রলার হয়ে উঠছে অবৈধ পণ্য পরিবহনের বাহন। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার যাচ্ছে সিমেন্ট, ওষুধ, চাল, ডাল, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আর আসছে ইয়াবা-আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। অনেক ক্ষেত্রে নগদ টাকার পরিবর্তে মাদক-মুদ্রায় (নার্কো কারেন্সি) লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ টাকার বদলে মাদকের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। মাদক ও তার বিস্তারে অপরাধ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশে সংঘটিত নানা ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের বীভৎসতা বিশ্লেষণ করলে লক্ষণীয় যে, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও মাদকাসক্ত অবস্থায় অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অপরাধ করার সময় অপরাধীদের কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, ব্যক্তিকে হত্যা করে টুকরা টুকরা করে তা নিয়ে উল্লাসও করছে। মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ২৪ ধরনের মাদক উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি ডি জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।
প্রচলিত মাদকের বাইরে এলএসডি, ডিএমটি, কেটামিন, এমডিএমএ ও সাইলোসাইবিনের মতো মাদকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব মাদক তুলনামূলক ছোট পরিসর এবং ভিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। এসব মাদক তুলনামূলক ছোট পরিসরে এবং প্রচলিত মাদকের চেয়ে ভিন্ন সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়াচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে চলছে মাদক কারবার। কারবার নিয়ন্ত্রণে বেশি কৌশলী নারী কারবারিরা। ঢাকার কাছে গাজীপুরেই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন শীর্ষ আট নারী। এই কারবার করেই তাঁরা বনে গেছেন কোটিপতি। বরিশাল বিভাগে নারী কারবারি বেড়েছে তিন গুণের বেশি। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জেও আছে নারী কারবারিদের চক্র।
গাজীপুরের মাদক কারবার নিয়ে কথা উঠলে শুরুতেই আসে টঙ্গীর নাম। যোগাযোগব্যবস্থা ও ভৌগোলিক কারণে রাজধানীসংলগ্ন টঙ্গীর হাজীর মাজার, ব্যাংক মাঠ, কেরানীরটেক, এরশাদ নগরসহ সেখানকার বস্তিগুলো দেশের অন্যতম মাদকের হাট হয়ে উঠেছে।
বস্তির খুপরি ও ঘিঞ্জি ঘরগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, প্রতিদিন এসব স্থানে কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। মাদক একটি নীরব ঘাতক, যা একটি পুরো প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা বা পুনর্বাসন এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা সাময়িক সমাধান মাত্র। যতক্ষণ না মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে এবং মাদক আসার রুটগুলো সিলগালা বা রুদ্ধ করা যাচ্ছে, ততক্ষণ মাদক মুক্ত সমাজ গঠন অলীক কল্পনা মাত্র।





