বায়ুদূষণে বাড়ছে উদ্বেগ, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

Sadek Ali
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:২৯ পূর্বাহ্ন, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# বায়ুদূষণের প্রভাবে দেশে বছরে মৃত্যু লাখের বেশি

# বছরে ক্ষতি ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা

আরও পড়ুন: রোগের চেয়ে সড়কে বেশি ঝরছে সুস্থ প্রাণ

# গড় আয়ু কমছে সাড়ে ৫ বছর

# বছরে ৬ লাখ ৭০ হাজার রোগী জরুরি বিভাগে ভর্তি

আরও পড়ুন: থাপ্পড় নিয়ে দেশ-বিদেশে যতো কাণ্ড

বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা শোনা যাচ্ছে। সাধারণত শীত এলে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়, বেড়ে যায় দূষণের মাত্রা। আর অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে বাতাস। যে বাতাস জীবনের মূল স্পন্দন, সেই বাতাসই এখন বয়ে আনছে অকাল মৃত্যুর পরোয়ানা। ঋতু পরিবর্তনের আবর্তে চারপাশ যখন কুয়াশায় ঢাকা পড়ার কথা, তখন ঢাকা সহ দেশের প্রধান শহরগুলো ঢেকে যাচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়াশার এক ধূসর চাদরে। কলকারখানার কালো ধোঁয়া, ইটভাটার বিষ, ফিটনেসবিহীন গাড়ির কার্বন আর অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ধুলাবালিতে প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে বাতাস। এই বিষাক্ত বাতাসে মিশে থাকা অতি ক্ষুদ্র কণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি মিশে যাচ্ছে মানুষের রক্তে। ফলে ঘরে ঘরে বাড়ছে ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও তীব্র শ্বাসকষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চরম সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাতাসের মান সূচক প্রতিদিন ছুঁয়ে যাচ্ছে বিপজ্জনক সীমা। বুকভরে বিশুদ্ধ বাতাস নেওয়ার আকুতি আজ এক অলীক বিলাসিতা, আর এই নীরব ঘাতকের গ্রাসে প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি, যা দেশের জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ ও অপূরণীয় সংকটের মুখে। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় গত বৃহস্পতিবার ১১তম অবস্থানে ছিল ঢাকা। বায়ুমান সূচকে ঢাকার স্কোর ১৪১, যা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান বিষয়ক ওয়েবসাইট আইকিউ এয়ারে এ তথ্য দেখা গেছে।

বায়ুদূষণে গত বৃহস্পতিবার বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষ স্থানে ছিল পাকিস্তানের শহর লাহোর, যার স্কোর ২৮৭। ২২২ ও ১৯৬ স্কোর নিয়ে যথাক্রমে তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিল ভারতের রাজধনী শহর দিল্লি ও কিরগিজস্তানের শহর বিশকেক। একটি শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, তার লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক জানিয়ে থাকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার। প্রতিষ্ঠানটির মানদণ্ড অনুযায়ী, যখন একিউআই স্কোর ৫০ থেকে ১০০ এর মধ্যে থাকে, তখন বায়ুর গুণমানকে ‘মাঝারি’ বলে বিবেচনা করা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় সাধারণত সংবেদনশীল ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে পরিশ্রম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে হলে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়, ২০১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে মনে করা হয়। ৩০১ এর বেশি হলে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে বছরে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এ ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।

একই সঙ্গে বায়ুদূষণের কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছেন প্রায় ২৪২ জন। সেই হিসাবে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ (সি-টু এএইচআর)’ ইউনিটের গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘পলিউশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাদলের প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি বড় শহরের বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে এ ফলাফল পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুর জন্য সবচেয়ে বড় বাহ্যিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের আয়ু গড়ে সাড়ে পাঁচ বছর কমছে। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সে (একিউএলআই) ২০২৫ সালের হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি)। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ। দেশটিতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি ধূমপান মানুষের আয়ু গড়ে দুই বছর এবং শিশু ও মায়ের অপুষ্টি গড়ে ১ দশমিক ৪ বছর কমিয়ে দিচ্ছে।

একিউএলআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৬৮ লাখ জনসংখ্যার সবাই এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বস্তুকণা (পিএম ২.৫) দূষণের বার্ষিক গড় মাত্রা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। এমনকি সবচেয়ে কম দূষিত শহর লালমনিরহাটেও বস্তুকণা দূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী ৭ গুণ বেশি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বাতাসে পিএম ২.৫ কণার ঘনত্ব ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে মানুষের আয়ু আরও ২ দশমিক ৪ বছর কমে গেছে। সবচেয়ে দূষিত বিভাগ ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী পিএম ২.৫ কণার ঘনত্ব কমানো গেলে মানুষের আয়ু ৬ দশমিক ২ বছর বৃদ্ধি পেত। পরিবেশবিদ শাহজাহান ওমর বলেন,আমরা ঢাকাকে বাসযোগ্য করার কথা বললেও একের পর এক পরিবেশবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে শহরটির ফুসফুস আজ অকেজো। ইটভাটার লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণহীন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি অবাধে চলছে এবং জলাশয় ভরাট করে ভারী শিল্প এলাকা বানানো হচ্ছে। কেবল শীতকালে পানি ছিটানো বা সাময়িক লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে এই বিষাক্ত ধোঁয়াশা দূর করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রতি বছর ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের মৃত্যু হচ্ছে। একই কারণে প্রতি বছর নয় লাখ মায়ের অকালপ্রসব হচ্ছে এবং প্রায় সাত লাখ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বায়ুদূষণজনিত সমস্যা নিয়ে প্রতি বছর ৬ লাখ ৭০ হাজার রোগী জরুরি বিভাগে ভর্তি হচ্ছে। এতে সম্মিলিতভাবে বছরে ২৬৩ মিলিয়ন কর্মদিবস হারিয়ে যাচ্ছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে সিআরইএ ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্মকণা বায়ুদূষণে জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় এ গবেষণা প্রকাশ করে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশের তালিকায় স্থান হয়েছে বাংলাদেশের। যেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বালুকণার বার্ষিক মান ৭৯ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম, যা বার্ষিক জাতীয় মানদণ্ড ৩৫ মাইক্রোগ্রামের দ্বিগুণের বেশি। এতে উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে। ২০১৯ সালে সার্বিকভাবে এ ব্যয় ১১ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ।

এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড পাঁচ মাইক্রোগ্রামের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি। বাতাসের এমন চরম দূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপর অনিবার্য পরিণতি ডেকে আনছে। বিভিন্ন বয়সীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআরইএর বায়ুমান বিশ্লেষক ড. জেমি কেলি বলেন, ‘বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার অপরিণত শিশু, কম ওজনের শিশুর জন্ম ও শিশুমৃত্যু ঘটছে। এ পরিস্থিতি এমন হস্তক্ষেপের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা সবচেয়ে অরক্ষিতদের সুরক্ষা দিতে সক্ষম।’