টানা দাবদাহে পুড়ছে দেশ, বিপর্যস্ত নগরজীবন
কয়েক দিনের টানা দাবদাহে পুড়ছে দেশ, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে নগরজীবন। রাজধানীজুড়ে প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও নেই স্বস্তি। বাসের ভেতরে হাঁসফাঁস যাত্রীরা, রাস্তায় কাহিল পথচারী আর খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ—সবাই ক্লান্ত। এমন অবস্থায় সবার একটাই অপেক্ষা, কবে নামবে স্বস্তির বৃষ্টি।
গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত রাজধানীতে বৃষ্টির দেখা মেলেনি। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ ঢাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনাও নেই। তবে দুপুরে তপ্ত রোদ না থাকলেও গরম ছিল তীব্র। এমন গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন নগরবাসী।
আরও পড়ুন: ঢাকায় আজও বৃষ্টি নেই, আকাশ থাকবে আংশিক মেঘলা
এদিন দুপুর ১২টার দিকে ভিক্টর বাসে করে পল্টন থেকে নতুনবাজার যাচ্ছিলেন গণমাধ্যমকর্মী সায়েদুল হক। বাড্ডা লিংক রোডে আসার পর যানজটে আটকে যায় তার গাড়ি। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ভেতরে থাকা যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। হঠাৎ গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পর এক যাত্রীকে উঠাতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন চালক ও তার সহকারী। অতিরিক্ত গরমের কারণে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন তারা।
শুধু ওই বাসটিই নয়, প্রতিটি গণপরিবহনে চিত্র এমনই। অতিরিক্ত যাত্রী আর গরমে বাসের ভেতর যেন উত্তপ্ত চুল্লি। জানালা খোলা থাকলেও ঢুকছে না বাতাস। ঘামে ভিজে একাকার যাত্রীরা; কেউ সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কারও হাতে পানির বোতল, কেউ কাগজ দিয়ে বাতাস করছেন। মাঝেমধ্যে তীব্র গরম ও ভিড়ের কারণে যাত্রীদের মধ্যে তর্কাতর্কিও দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেশজুড়ে ভ্যাপসা গরম, জনজীবন বিপর্যস্ত
এক যাত্রী বলেন, “তীব্র গরমের কারণে অফিসে যাওয়ার পথটাই এখন সবচেয়ে কষ্টের। বাসে উঠলেই মনে হয় এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে যাবে।”
শুধু বাসযাত্রী নয়, রাস্তায় থাকা পথচারীদের অবস্থাও কাহিল। মাথায় কাপড় বা ছাতা দিয়ে রোদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন অনেকে। তবুও তপ্ত সড়কে হাঁটতে গিয়ে কেউ কেউ বারবার থেমে যাচ্ছেন, অনেকে খুঁজছেন একটু ছায়া বা পানির ব্যবস্থা।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ভ্যানচালক—যাদের কাজ থামানোর সুযোগ নেই, তাদের দিন কাটছে চরম কষ্টে। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে জীবিকার তাগিদে।
মধ্যবাড্ডা এলাকায় এক নির্মাণশ্রমিক বলেন, “দুপুরের রোদে লোহা ধরাই যায় না, হাত পুড়ে যায়। তবুও কাজ থামানোর সুযোগ নেই, না করলে মজুরি পাব না।”
শাজাহানপুর এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে নিয়োজিত এক কর্মী বলেন, “চুলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এজন্য গরমটা বেশি লাগে। মাথা ঝিমঝিম করে। কিন্তু উপায় নেই, সংসার চালাতে হলে কাজ করতেই হবে।”
নতুনবাজার এলাকায় শফিকুল নামে এক রিকশাচালক বলেন, “রোদে রিকশা চালানো অনেক কষ্টের কাজ। মাঝে মাঝে মনে হয় মাথা ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় তো নেই।”
বারিধারা এলাকার এক রিকশাচালক বলেন, “সকাল থেকে রিকশা চালাচ্ছি। গরমের কারণে মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। তবে গাছ বেশি থাকায় তুলনামূলক একটু স্বস্তি পাচ্ছি।”
চিকিৎসকরা বলছেন, এমন গরমে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই বেশি করে পানি পান এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বৃষ্টির বার্তায় যা বলছে আবহাওয়া অফিস: গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার জন্য যে পূর্বাভাস আবহাওয়া অধিদপ্তর দিয়েছে, তাতে আজ ঢাকায় বৃষ্টি হওয়ার কোনো সুখবর নেই। তবে চার বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সরকারি সংস্থাটি।
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির জানান, সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলাসহ রাজশাহী বিভাগের (৮টি জেলা) ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হওয়ার আভাস আছে। এই সময় সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বিরাজমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।
কাল শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে ঢাকায় বৃষ্টি না হওয়ার আভাস দেওয়া হলেও ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আগামী শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
পরের দিন রোববার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
বর্ধিত পাঁচদিনে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থাটি।





