প্রচণ্ড শীতল হাওয়ায় কাবু করেছে সুন্দরবনের ৫০ হাজার বনজীবী

Sanchoy Biswas
সৈয়দ আব্দুস সালাম পান্না, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ৭:০৪ অপরাহ্ন, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ২:৩১ পূর্বাহ্ন, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল পঞ্চাশ হাজার বনজীবী হাড় কাঁপানো শীতে বিপাকে পড়েছে। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, কাকড়া আহরণ করা দুই মাসের জন্য সুন্দরবনের নিষিদ্ধ থাকলেও অন্যান্য জাল দিয়ে মৎস্য আহরণ করা চালু আছে। কিন্তু হিমেল হাওয়া আর প্রচণ্ড ঠান্ডায় যেতে-থাকতে মেরে গেছে সুন্দরবনের উপর জীবিকা নির্ভরশীল অন্তত ৫০ হাজার বনজীবী।

সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার ‌মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মধুজিৎ জানান, প্রচণ্ড শীতের কারণে আজ এক সপ্তাহ কোনো বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করছেন না। বিচরণ ক্ষেত্র সুন্দরবন, যেখানে গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায় বানরের দল। ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী দাপিয়ে বেড়ায় স্থলে, আর কুমিরসহ ২৯১ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ লোনা পানিতে সাতরায়।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে জমি নিয়ে বিরোধে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ১৩

ম্যানগ্রোভ এই বনের বন্যপ্রাণী ও মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র আহরণ করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে। নতুন বছরের শুরুতেই যেন তাদের কষ্টের গল্প বাকি রয়ে যাচ্ছে। তারা বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে দু’বেলা দুমুঠো ভাতের আশায়।

জানা যায়, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ২ লাখ হরিণসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড ও ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনের ৩টি এলাকা ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জলভাগে কুমির, ৬ প্রজাতির ডলফিনসহ ২৯১ প্রজাতির মাছ রয়েছে।

আরও পড়ুন: নরসিংদীতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার, আটক ৩

অক্সিজেনের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৭,০০০ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবনের এই অফুরন্ত সম্পদের ওপর নির্ভর করে যারা জীবীকায়ন করে, তাদেরকে এক কথায় বনজীবী বলা হয়। এছাড়া সুন্দরবনের গাঁ-ঘেষে যেসব এলাকায় বসবাস করে মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ, তারা তিন বেলার আহারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অনেকে আবার জীবীকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ছুটছেন বিভিন্ন শহরে। ফলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চিরায়ত একটি পেশা।

এই বনজীবী এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের পুরুষরা সুন্দরবনে গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করেন। শিশুরাও তাদের সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। নারীরা সংসারের কাজ করে চিংড়ি পোনা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করতে নদীর পাড়ে অধিকাংশ সময় থাকতে হয় নারীদের। মেয়েশিশুরা থাকে মায়ের সহযোগী হয়ে। আবার পেটের টানে প্রয়োজনে নারীরা কখনও কখনও নৌকায় চেপে সুন্দরবনেও যান মাছ ধরতে।

স্যাতক্ষীরা উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর এলাকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা সুন্দরবন ভিত্তিক। সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার পাতাখালি, চন্ডিপুর, পাখিমারা, ঝাঁপালি, বড় কুফট, নওয়াবেকি, কাশি মাড়ি, বুরি গোয়ালেন, গাবুরা, পারশেমারি, চাঁদনী মুখা, দাতি না খালি, দুর্গা বাটি, পরাকাট লা, কলবাড়ি, চন্ডিপুর, মুন্সিগঞ্জ, মৌখালী, দক্ষিণ কদমতলা, পূর্বকালীনগর, মথুরাপুর, কুলতলী, ধুম ঘাট, হরিনগর, সিংহর তলী, চুনকুড়ি, মারা গান, যতীন্দ্রনগর, ছোটভেট খালি, টেংরাখালী, পার্শ্বে খালি, কাল ইঞ্চি, কৈখালী, ভেটখালী, দক্ষিণ পরানপুর, পশ্চিম পরানপুর—এইসব এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।

তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর প্রাকৃতিক নানা কারণে বনজীবীরা এখন আর বনে গিয়ে সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে এখানে বসবাসরত বনজীবীদের টিকে থাকা কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই বাপ-দাদার আমল থেকেই সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন তাদের বছরের একটা বড় সময়ই কর্মহীন থাকতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই বনের কাজ ছেড়ে মাটিকাটা, নদীভাঙন রোধে ব্লক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে সেখান থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকে সংসারের চাকা চলে না।

শ্যামনগর ‌উপজেলার মুন্সিগঞ্জ গ্রামের আতিয়ার রহমান জানান, “বাদায় (বনে) গিয়ে আর পেট চলে না। মাঝে মাঝে শহরে যাই কাজ করতে, কিন্তু সেখানে মন টেকে না। বাদায় মন টানে। তাই আবার বাপ-দাদার পেশায় ফিরে আসি। আয় না থাকলে, গাঙ (নদী) পাড়ে বসে বাদার দিকে তাকাই। কি করবো? কোন তাল পাই না। আবার সুন্দরবনের কথা মনে উঠলে জলদস্যুরা ভয়ে চোখে পানি আসে।”

একই উপজেলার ভেটখালী এলাকার আমজাদ হোসেন জানান, “বাদা ছেড়ে যাবো কনে? নদীতে পোনাও তেমন পাচ্ছি না। তারপর আবার নদীতে গেলে ফরেস্টাররা তাড়িয়ে দেয়। তবু পড়ে আছি সুন্দরবনের মুখের দিকে তাকিয়ে।”

পশ্চিম ‌বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান জানান, সুন্দরবন এখন কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে রয়েছে। কাঠ চুরি বা বনের মধ্যে কোনও ধরণের অপরাধের সুযোগ নেই। তাই পাশ পারমিট ছাড়া কোনও লোকই এখন বনে যেতে পারে না। পাস পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া বনজীবীরা নির্বিঘ্নে অনুমোদিত কাজ করতে পারে। বন প্রহরীরা প্রতিটি এলাকায় কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তবে প্রকৃত বনজীবী এবং উপজাতি বা মুন্ডা সম্প্রদায়ের জন্য পাস পারমিটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

পুরুষরা মাছ ধরে, গোলপাতা কাটে, কাঁকড়া ধরে আর মধু আহরণ করে। নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। আবার নারীরা কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে। শিশুরা হাঁটাচলা শিখে বাইরে বের হওয়ার পর থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না।