রাজশাহীর আমের তুলনা নেই: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

Sadek Ali
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩৪ অপরাহ্ন, ১৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৭ অপরাহ্ন, ১৬ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ট্রেন্ট টি ক্রিন্সেটেনসেন। রাজশাহীর পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আম হাটে এসে একের পর এক আমের স্বাদ নিলেন। খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও গোপালভোগের স্বাদ গ্রহণের পর তার মন্তব্য “রাজশাহীর আমের তুলনা নেই, সত্যিই খুব মজা!” রাষ্ট্রদূতের এই প্রশংসা শুধু একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উত্তরাঞ্চলের চার জেলা—রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার কোটি টাকার আম অর্থনীতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও বটে। চলতি মৌসুমে এ চার জেলায় প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার অর্থনৈতিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বানেশ্বর আম হাটে রাষ্ট্রদূতের মুগ্ধতা: 

আরও পড়ুন: থামছে না পুশ-ইন চাপ, অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

মঙ্গলবার সকালে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আম হাট পরিদর্শন করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তার সঙ্গে ছিলেন মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক কাউন্সেলর ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

হাটে বিভিন্ন জাতের আম ঘুরে দেখার পাশাপাশি তিনি সরাসরি কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। আমের স্বাদ গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রদূত জানান, রাষ্ট্রদূত হিসেবে এটি তার প্রথম রাজশাহী সফর। যদিও ২০২০ সালে ব্যক্তিগতভাবে এ অঞ্চলে এসেছিলেন, তবে এবার তিনি বিশেষভাবে আমের মৌসুমকে কেন্দ্র করেই এসেছেন।

আরও পড়ুন: দুবাইয়ে বেনজীর গ্রেফতারের পর ফের আলোচনায় সাভানা ইকো রিসোর্ট

তিনি বলেন, কৃষিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো পণ্যের প্রকৃত স্বাদ জানতে হলে তার উৎপাদনস্থলে যেতে হয়। আর রাজশাহীর আমের স্বাদ ও গুণগত মান তাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।

উত্তরাঞ্চলে আমের বাম্পার মৌসুম: 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের চার জেলা—রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে মোট ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৮ হাজার থেকে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। 

জেলা ভিত্তিক সম্ভাব্য উৎপাদন চিত্র জেলা, রাজশাহ প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টন, নওগাঁ প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টন

নাটোর, প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টন, মোট প্রায় ১২.৫৫ লাখ টন।  

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি বিভাগ। 

কোন আমের দাম কত?

মৌসুমের শুরুতে বাজারে গোপালভোগ ও রানীপছন্দের দাম বেশি থাকলেও এখন খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও আম্রপালির সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে বাগান ও পাইকারি বাজারভেদে প্রতি কেজি আমের গড় দাম—গোপালভোগ, কেজিপ্রতি দাম (টাকা) ৬০-৮০, খিরসাপাত (হিমসাগর), ৭০-১২০, ল্যাংড়া ৬০-১০০, আম্রপালি, ৮০-১৩০, ফজলি, ৫০-৮০, বারি-৪, ৮০-১৪০ । 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের মধ্যভাগে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে উন্নত মানের রপ্তানিযোগ্য আমের দাম তুলনামূলক বেশি থাকবে।

শুধু ফল নয়, হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি: 

আমকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় লক্ষাধিক মানুষের। বাগান পরিচর্যা, আম সংগ্রহ, ঝুড়ি তৈরি, প্যাকেজিং, পরিবহন, কুরিয়ার, অনলাইন বিক্রি ও রপ্তানি—সব মিলিয়ে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে।

কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং ও রপ্তানিসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মূল্য এবার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়ছে সম্ভাবনা: 

মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমের চাহিদা অনেক বেশি। সেখানে সাধারণত হিমায়িত আম বেশি পাওয়া যায়, যা জুস ও শেক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে রাজশাহীর মতো টাটকা আম পাওয়া কঠিন।

কৃষি ও রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রদূতের এ সফর বাংলাদেশের আমের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রাজশাহীর খিরসাপাত, আম্রপালি ও ফজলির চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

কৃষকের মুখে হাসি, রপ্তানিকারকের চোখে নতুন স্বপ্ন

গত কয়েক বছর ধরে আধুনিক চাষাবাদ, নিরাপদ উৎপাদন ও জিআই স্বীকৃতির কারণে রাজশাহী অঞ্চলের আমের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এবারের মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। আর বানেশ্বর আম হাটে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি যেন সেই হাসিকে আরও উজ্জ্বল করেছে।

উত্তরাঞ্চলের আম এখন আর শুধু মৌসুমি ফল নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। আর সেই সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে রাজশাহীর আম—যার স্বাদে মুগ্ধ হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশের রাষ্ট্রদূতও।