বন্যহাতির লোকালয়ে হানা, ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম কৃষক

Sanchoy Biswas
রাকিবুল আওয়াল পাপুল, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:১৮ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬ | আপডেট: ৮:২৩ অপরাহ্ন, ০৩ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শেরপুর সীমান্তে সন্ধ্যা নামলেই বন থেকে হাতির দল লোকালয়ে এসে সাবাড় করছে ক্ষেতের ধান। হানা দিচ্ছে বাড়িঘর ও বাগানে। বন্যহাতির কবল থেকে ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। অনেকেই কেটে ফেলছেন আধাপাকা ধান।

পাহাড়ি এলাকার কৃষকেরা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিনিয়তই ধানক্ষেতে নেমে আসছে বন্যহাতির দল। গত দুই সপ্তাহ ধরে শতাধিক বন্যহাতি একাধিক দলে ভাগ হয়ে গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে ক্ষেত। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবাসীরা।

আরও পড়ুন: গাজীপুরে এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর চেয়ারে বসলেন জামায়াতের এমপি, ছবি ভাইরাল

হাতি তাড়াতে কেরোসিন দিয়ে মশাল জ্বালিয়ে ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

এদিকে, বোরো ধান কাটার মৌসুম সামনেই। এই সময়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বন্যহাতির তাণ্ডব। প্রায় প্রতিদিনই বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় খাবারের সন্ধানে অরণ্য থেকে ধানক্ষেতে দলবেঁধে নেমে আসছে হাতিরা। ফসল রক্ষা করতে ধানক্ষেতে টঙঘর বানিয়ে রাতদিন পাহারা দিচ্ছেন কৃষকেরা। ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে বন্যহাতির অত্যাচার বেড়েছে দ্বিগুণ। কোনোভাবেই ক্ষুধার্ত হাতিগুলোকে দমানো যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার কৃষকেরা ইতোমধ্যে আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন।

আরও পড়ুন: পটুয়াখালী জেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত

ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধীগাঁও এলাকার কৃষক জুলহাস উদ্দিন বলেছেন, ‘আমি ধারদেনা করে অনেক কষ্টে ইরিধান চাষ করেছিলাম। হাতি আমার সব শেষ করে দিয়েছে। সারা বছর কী খাব, আর ধারদেনা পরিশোধ করব কীভাবে?’

ষাটোর্ধ কৃষাণী মতিজান বিবি বললেন, ‘স্বামী নাই, পোলাডারে (ছেলে) নিয়ে থাকি। কত কষ্ট করে আবাদ করলাম, হাতি তো সব শেষ করে দিল। এখন আমাদের কী হবে? সরকার একটা ব্যবস্থা করুক। হাতি হাতির জায়গায় থাকুক, আমরা আমাদের জায়গায় থাকি।’

দাওধারা গ্রামের কৃষক সেকান্দর আলী অভিযোগ করেন, বন্যহাতি যা ক্ষতি করে সরকার তার চার ভাগের এক ভাগও ক্ষতিপূরণ দেয় না। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার।

নালিতাবাড়ী উপজেলার আন্ধারুপাড়া গ্রামের গারো আদিবাসী কৃষক মেজেস সাংমা বলেছেন, ‘ফসল বাঁচাতে আমরা খেতের পাশে টঙঘর বানিয়ে রাতদিন পাহারা দিই। আমরা চিৎকার, হৈ-হুল্লোড় করে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে আবার কখনো মশাল জ্বালিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমানে কেরোসিন তেলের সরবরাহ কম থাকায় ও দাম বেশি হওয়ায় হাতি তাড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি জানান, বনবিভাগ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তা সবাই পায় না। বিশেষ করে জমির কাগজপত্রের কারণে বর্গাচাষীরা ক্ষতিপূরণ পান না। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণ কম পাওয়া যায়।

এছাড়া হাতি আক্রান্ত এলাকায় উচ্চ শক্তিসম্পন্ন আলো জ্বালানোর দাবিও জানান তিনি।

পরিবেশবাদী সংগঠন সাঈন-এর নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক মুগনিউর রহমান মনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করে আসছি। শুধু কথাই দেওয়া হয়, বাস্তবায়ন করা হয় না।’

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক এসবি তানভীর আহমেদ ইমন জানান, গারো পাহাড়ে হাতির পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও হতাহতদের সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে সহাবস্থানের জন্য আমরা এলাকার মানুষদের সচেতন করছি। কৃষক যাতে সহজে তাদের ক্ষতিপূরণ পায় সে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।’

সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা সাময়িক। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়তই সংসদে কথা বলে যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সময়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। তিনটি উপায় নিয়ে আমরা সামনে এগোতে চাই—অভয়ারণ্য, হাতির খাদ্য ও পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং সোলার ফেন্সিং বা সৌর বেড়ার ব্যবস্থা।’

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যহাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ এবং ফসলের ক্ষতির জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার।

প্রসঙ্গত, ভারতের সীমান্তঘেঁষা জেলা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ গারো পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই চলছে হাতির উপদ্রব। এরপর থেকে প্রতি বছরই ফসলের মৌসুমে লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় বন্যহাতির দল। বিভিন্ন সময়ে হাতি তাড়াতে গিয়ে মারা গেছেন কৃষক, আবার মৃত্যু হয়েছে হাতিরও।