ইউটিউব দেখে সমন্বিত চাষে সফল তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সুমন, বছরে আয় ১৫ লক্ষ টাকা

Sadek Ali
মো. তরিকুল ইসলাম, পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১:১৫ অপরাহ্ন, ২৮ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, ২৯ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চাকরির পেছনে না ছুটে ইউটিউব দেখে আগ্রহী হয়ে সমন্বিত কৃষি চাষ করে সারা ফেলেছেন পিরোজপুরের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা জাহিদুল মাহমুদ সুমন। প্রায় ৪ শতাধিক পেঁপে গাছ ও মাছ চাষ সহ বিভিন্ন ফল উৎপাদনে সফল হয়েছেন তিনি। স্থানীয়রা তার সফলতা দেখে উদ্যোগী হচ্ছেন সমন্বিত কৃষি চাষে। সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে সমন্বিত কৃষি চাষের পরিধি আরো বেশি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

নিজের মেধা আর শ্রমকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত কৃষি চাষে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার রাধানগর এলাকার উদ্যোক্তা জাহিদুল মাহমুদ সুমন। ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করে এই কৃষি প্রকল্প। তার এই চোখ ধাঁধানো সফলতা দেখে এখন স্থানীয় অনেক বেকার যুবকই সমন্বিত কৃষি চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: যুবদল নেতা ওয়ারেস উদ্দিন ফরাসের জানাজায় কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণ

কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা খামারটিতে রয়েছে পেঁপে, আম, বাতাবি লেবু এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ। মাত্র ৮৮ শতক জমি নিয়ে ২০২২ সালে এই সমন্বিত কৃষি চাষ। শুরুর তিন বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে প্রায় ৫ একর জমিতে। যেখান থেকে বছরে উপার্জন করছেন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের কাছে সুমনের এই সমন্বিত কৃষি খামার হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুকরণীয় মডেল।

খামারের প্রধান আকর্ষণ ভারতীয় শাহী জাতের পেঁপে। প্রতিটি পেঁপের ওজন তিন থেকে চার কেজি পর্যন্ত। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে ৩৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খামারে রয়েছে প্রায় চার শতাধিক এর ও বেশি পেঁপে গাছ। প্রতিটি গাছ থেকেই বছরে গড়ে প্রায় তিন হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি হয়। এই ফসল স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে উৎপাদিত পেঁপে। এছাড়াও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে এলাকার কর্মহীন মানুষের।

আরও পড়ুন: কালীগঞ্জে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী আটক

শুধু পেঁপে চাষেই সীমাবদ্ধ নয় সুমনের উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে তিনটি মাছের পুকুর। সেখানে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতলা, গুলিশা ও গলদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের সমন্বয়ে বাড়ছে লাভের পরিমাণ।

মাছ ও পেঁপের পাশাপাশি খামারে রয়েছে আম ও বাতাবি লেবুর বাগান। খামারটিতে নিয়মিত কাজ করছেন পাঁচজন শ্রমিক। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই ভান্ডারিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই সমন্বিত কৃষি প্রকল্প দেখতে আসছেন।

এত বড় উদ্যোগ গড়ে তুললেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি অনুদান পাননি সুমন।

তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদুল ইসলাম সুমন বলেন, “আমি মূলত পেঁপে চাষ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করি। একদিন ইউটিউবে দেখি, বরিশালের বাবুগঞ্জে ভালো একটি পেঁপের বাগান। ইউটিউবে বাগানটি দেখে আমার কাছে অনেক ভালো লাগে। পরে আমি সেই বাগানে যাই এবং ওই বাগান থেকে চারা নিয়ে আসি। চারাগুলো সঠিকভাবে রোপনের চার মাস পরেই ফল আসতে শুরু করেছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমার পেঁপে বাগানে প্রতি গাছে দেড় থেকে দুই মণ পেঁপে আছে। একটা গাছ ২ থেকে ৩ বছর থাকে। একটা গাছ থেকে মোট ৫ থেকে ৬ মণ পেঁপে পাওয়া যায়। এছাড়া আমার এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আছে। যেমন তেলাপিয়া, হাইব্রিড পাঙ্গাস, লইট্টা, কোরাল, আইড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছও আমি করছি। এখানে চার শতাধিক পেঁপে গাছ আছে।

তিনি আরো বলেন, আমার বছরে খরচ বাদ দিয়া ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা প্রফিট আসতে পারে। সরকারের কাছে দাবি থাকবে, যেন আমাকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে বিনা সুদে যে লোনটা পাওয়া যায়, ওই লোনটা যদি পাই, এখানে আমি বড় আধুনিক কৃষি প্রজেক্ট গড়ে তুলবো। যেখান থেকে মানুষের কর্মসংস্থান হবে।”

স্থানীয় দর্শনার্থী মহিবুল্লাহ শেখ বলেন, সুমন ভাই ভান্ডারিয়ার এই গ্রামে কৃষি প্রজেক্ট করছে। এখানে প্রায় ৪০০ পেঁপে গাছ দেখছি। প্রতিটি গাছে প্রায় তিন মণ করে পেঁপে আছে। কিছুদিন আগে ৫০ মণ মাছ বিক্রি করছে। এখানে আম গাছ আছে, অনেক আম দেখছি, তিন কেজি ওজন হয়েছে। এখানে স্থানীয় অনেক বেকার কাজের সুযোগ পেয়েছে। আমাদের এলাকায় এরকম কৃষি উদ্যোক্তা বৃদ্ধি পেলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো।

সুমনের কৃষি প্রজেক্টের শ্রমিক লিটন শেখ বলেন, “আমাদের এলাকায় এই কৃষি প্রজেক্টটি হওয়ায় অনেক ভালো হয়েছে। কারণ এই প্রজেক্ট যখন করছে, আমি তখন থেকে এখন পর্যন্ত কাম করি। আমার কাম হইছে বীজ গাড়া, খেত দেখা, খেতে সার দেওয়া, বেচাকেনা। আগে অনেক জায়গায় অনেক কাজে যাওয়া লাগত, এখন সে কাজে যাওয়া লাগে না। চিন্তা-ভাবনা করা লাগে না। আমার যা বেতন দেয়, পরিবার সহকারে চলতেছে।”

কৃষি প্রজেক্টের কর্মচারী জয়নাল হাওলাদার বলেন, এখানে তিনটা পুকুর আছে, ৪০০ পেঁপে গাছ আছে। এগুলো দেখাশোনা করি। যাবতীয় যা লাগে তাই আমরা করি। এই প্রজেক্টের জন্য ভালো একটি কর্মস্থান হইছে। কর্মস্থলে খুব ভালো লাগে। বাহিরে যাওয়া লাগে না। বাহিরে বেতন কম, এখানে বেতন ভালোই। মোটামুটি চলে।

ভান্ডারিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদ মাহমুদ বলেন, “সুমন একজন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি আসলে বর্তমানে তরুণ কৃষকদের কাছে রোল মডেল। তিনি পাঁচ একর জমিতে বাগান করেছেন। এখানে ৪০০ শাহী জাতের পেঁপে রয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন। এখানে মাছ চাষ সহ বিভিন্ন জাতের ফলেরও গাছ রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই তার এই কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে। আমরা উনার মাটি তৈরি থেকে শুরু করে ফল আসা পর্যন্ত প্রত্যেকটা মুহূর্তে সহযোগিতা করে যাচ্ছি এবং সামনেও সকল প্রকার কার্যক্রমে সহযোগিতা করব। বিশেষ করে সামনে উনাকে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (GAP) প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে আমরা আশা করি, উৎপাদিত তার পেঁপে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।”

সঠিক সহযোগিতা পেলে এই তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে পিরোজপুরে সমন্বিত কৃষি চাষ আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।