চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট: উৎপাদন কমেছে শিল্পে, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ
ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট। আবাসিক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। একই সঙ্গে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে শিল্প-কারখানা। সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সংকট শুরুর পর সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক—সব খাতেই তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: গাজীপুর সদর উপজেলায় জালিয়াতির মাধ্যমে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি খারিজের অভিযোগ, মামলা বিচারাধীন
সংকটের কারণে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার রান্না করতে হচ্ছে বিকেল বা গভীর রাতে। অনেকে বাধ্য হয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অটোরিকশা, মাইক্রোবাসসহ সিএনজিচালিত যানবাহনগুলোকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক চালক গ্যাস না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের সমাপনী
গ্যাসের সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্প খাত। কেজিডিসিএলের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এদিকে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে না।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সবকিছুই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
জানা গেছে, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ গ্যাসের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা চলছে। ১ আগস্ট দুপুরের পর পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা আরও খারাপ হয়েছে। গ্যাসের প্রেসার ও ফ্লো কম থাকায় সংকট বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।





