গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাবুই পাখির বাসা এখন আর চোখে পড়ে না

Sadek Ali
ফরিদ আহমেদ,নবীনগর
প্রকাশিত: ২:২১ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪৩ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে তাল, নারিকেল, সুপারি ও খেজুরগাছের ডালে সারি সারি বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত চারপাশ। প্রকৃতির নিপুণ কারিগর হিসেবে পরিচিত বাবুই পাখি খড়, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতা দিয়ে তৈরি করত দৃষ্টিনন্দন বাসা। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, বাসযোগ্য পরিবেশ ও খাদ্যের সংকট, নির্বিচারে তালগাছ কর্তন এবং পাখি শিকারসহ নানা কারণে বাবুই পাখি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ১৫-২০ বছর আগেও নবীনগরের গ্রামগঞ্জে যেখানে অহরহ বাবুই পাখির বাসা চোখে পড়ত, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকটি গাছে এসব বাসা দেখা যায়।

আরও পড়ুন: শ্রীনগরে পুলিশের লুট হওয়া ৫০ শটগান কার্তুজ উদ্ধার

স্থানীয়রা জানান, বাবুই পাখি সাধারণত উঁচু ও নিরিবিলি পরিবেশে বাসা বাঁধে। তাল, নারিকেল ও খেজুরগাছ তাদের পছন্দের আবাস। এসব গাছের সংকট দেখা দেওয়ায় কোথাও কোথাও হিজল গাছেও বাবুইয়ের বাসা দেখা যায়। কিন্তু বড় বড় গাছ কেটে ফেলা এবং নির্বিচারে পাখি শিকারের কারণে এ পাখির আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

বাবুই পাখির বাসা নির্মাণের কৌশলও বেশ চমকপ্রদ। ঠোঁট দিয়ে ঘাস ও পাতার আঁশ ছড়িয়ে তা পেটের সাহায্যে ঘষে মসৃণ করে নেয়। এরপর বাসা তৈরির শুরুতেই দুটি নিম্নমুখী গর্ত তৈরি করে। পরে একটি অংশ বন্ধ করে ডিম পাড়ার স্থান এবং অন্য অংশে লম্বা প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ তৈরি করে। ঝড়-বৃষ্টিতেও যাতে বাসা সহজে ছিঁড়ে না পড়ে, সেজন্য বিশেষ কৌশলে তা গাছের ডালের সঙ্গে শক্ত করে বুনে দেয়। বাসার ভেতরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য তৈরি করে আড়াও।

আরও পড়ুন: নিখোঁজের ৫ দিন পর অটোচালকের মরদেহ উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩

প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র পাখির বাসা শুধু শৈল্পিক নিদর্শন নয়, মানুষের জন্যও অনুপ্রেরণার। নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হয়, বাবুই পাখির জীবনযাপন যেন তারই উদাহরণ।

কৃষ্ণনগর গ্রামের প্রবীণ অলেক মিয়া বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমাদের গ্রামের কয়েকটি তালগাছে বাবুই পাখির বাসা দেখছি। পাখি ও তাদের বাসা দেখতে এবং কিচিরমিচির শব্দ শুনতে খুবই ভালো লাগে। একসময় আরও অনেক বাসা দেখা যেত।’

গৃহিণী আসমা বেগম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনের তালগাছে বাবুই পাখি বাসা বানিয়েছে। ছোটবেলায় অনেক বাবুই পাখি ও বাসা দেখেছি। এখন আর তেমন দেখা যায় না।’

সাংস্কৃতিককর্মী মাহমুদ বলেন, তালগাছ নিধন ও অবাধে পাখি শিকারের কারণে বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। এ পাখি রক্ষায় বড় বড় তালগাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন করে তালসহ দেশীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে।

সুর সম্রাট আলাউদ্দীন খাঁ ডিগ্রি কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সারাবিশ্বে বাবুই পাখির প্রজাতির সংখ্যা ১১৭টি। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বাবুই পাখি রয়েছে। এদের প্রধান খাবারের মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়।’

তিনি আরও বলেন, বাবুই পাখির জন্মগতভাবেই বাসা তৈরির অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে। সামাজিকভাবে বসবাস করায় এদের সামাজিক পাখিও বলা হয়। প্রজনন মৌসুমে এদের তৎপরতা বেড়ে যায়। কৃষকের ধান ঘরে তোলার সময়ের সঙ্গে বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুমেরও মিল রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় তালগাছের সারি আর বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যের অংশ। সেই দৃশ্য এখন কেবল স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। প্রকৃতির এই স্থপতিকে টিকিয়ে রাখতে তালগাছ ও অন্যান্য দেশীয় গাছ সংরক্ষণ, নতুন করে বৃক্ষরোপণ এবং পাখি শিকার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।